রবিবার, ২ অক্টোবর 2022 বাংলার জন্য ক্লিক করুন
  
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|

   উপসম্পাদকীয় -
                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                 
মহাষষ্ঠীর মধ্য দিয়ে শুরু শারদীয় দুর্গোৎসব

জসিম উদ্দিন তুহিন:
উলুধ্বনি, শঙ্খ, কাঁসর আর ঢাকের বাদ্যিতে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব দুর্গাপূজা শুরু হয়েছে শনিবার ((১ অক্টোবর)) সকাল থেকে। শারদীয় দুর্গোৎসবের আজ মহাষষ্ঠী। বুধবার (৫ অক্টোবর) বিজয়া দশমীতে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হবে পাঁচ দিনের এ মহোৎসব।

বৈশ্বিক মহামারি করোনার প্রাদুর্ভাবে গত দু`বছর অনেকটাই নিষ্প্রাণ ছিল বাঙালি হিন্দুর সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা। আলোকসজ্জাসহ উৎসবসংশ্নিষ্ট বিষয় পরিহার করে কেবল `সাত্ত্বিক পূজায়` সীমিত রাখা হয়েছিল আয়োজন; ছিল বাড়তি সতর্কতা ও স্বাস্থ্যবিধি মানার বিষয়গুলোও। তবে এবার করোনার সংকট ও ভয় কাটিয়ে ফিরে এসেছে চিরচেনা সেই উৎসবের আমেজ। সারাদেশের মণ্ডপ-মন্দিরে বর্ণাঢ্য উৎসবের প্রস্তুতিও এখন শেষ হয়েছে।

এ বছরের দুর্গাপূজার নির্ঘণ্ট অনুযায়ী, আজ শনিবার ষষ্ঠীতে দশভুজা দেবী দুর্গার আমন্ত্রণ ও অধিবাসের মধ্য দিয়ে শুরু হবে পূজার আনুষ্ঠানিকতা। ষষ্ঠী তিথিতে আজ সকাল সাড়ে ৬টার মধ্যে দেবীর ষষ্ঠাদি কল্পারম্ভ ও ষষ্ঠীবিহিত পূজা। সায়ংকালে দেবীর আমন্ত্রণ ও অধিবাসের মধ্য দিয়ে শুরু হবে মূল দুর্গোৎসব। এদিন সকাল থেকে চণ্ডীপাঠে মুখরিত থাকবে সব মণ্ডপ এলাকা। আগামীকাল রোববার মহাসপ্তমী, ৩ অক্টোবর মহাষ্টমী ও কুমারীপূজা এবং ৪ অক্টোবর মহানবমী শেষে ৫ অক্টোবর বিজয়া দশমী ও প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হবে পাঁচ দিনের দুর্গোৎসব।

তবে শুক্রবার পঞ্চমীর সন্ধ্যায় বোধনের মধ্য দিয়ে দেবীর আগমনধ্বনি অনুরণিত হতে শুরু করেছে। সারাদেশের পূজামণ্ডপগুলোতে অনুষ্ঠিত হয়েছে দেবীর বোধন। শারদীয় দুর্গোৎসবের প্রাক্কালে এই বোধনের মাধ্যমে দক্ষিণায়নের নিদ্রিত দেবী দুর্গার নিদ্রা ভাঙার জন্য বন্দনা করা হয়। মণ্ডপে-মন্দিরে পঞ্চমীতে সায়ংকালে তথা সন্ধ্যায় এই বন্দনা অনুষ্ঠিত হয়।

শনিবার সকাল ৮টার দিকে রাজধানীর সিদ্ধেশ্বরী মন্দিরে দেবীর ষষ্ঠাদি কল্পারম্ভের মধ্য দিয়ে শুরু হয় ষষ্ঠীর দিনের পূজা। সিদ্ধেশ্বরী ছাড়াও ঢাকা ও সারা দেশের সব মন্দিরের প্রায় কাছাকাছি সময়ে শুরু হয়েছে ষষ্ঠীপূজার আয়োজন। এ সময় ঢাকঢোলের বাজনা, কাঁসা, শঙ্খের আওয়াজ এবং ভক্তদের উলুধ্বনিতে দেবী দুর্গাকে পৃথিবীতে স্বাগত জানানো হয়। সন্ধ্যায় হবে দেবীর বোধন, আমন্ত্রণ ও অধিবাস। বোধন অর্থ জাগ্রত করা। মর্ত্যে দুর্গার আবাহনের জন্য বোধনের রীতি প্রচলিত রয়েছে।

এদিকে পূজা উপলক্ষে নতুন রূপে সেজে উঠেছে ঢাকেশ্বরী মন্দিরসহ রাজধানীর অন্যসব মন্দির। ঢাকা মহানগরের মধ্যে ভক্ত ও দর্শনার্থীদের প্রধান আকর্ষণ থাকে এই মন্দির। সেই সঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হলের মন্দিরেও দুর্গাপূজায় থাকছে বিশেষ আয়োজন। ঐতিহ্যবাহী বনানী মাঠে আয়োজিত দুর্গা মণ্ডপে সাজানো হয়েছে আরও সুন্দর রূপে।

প্রতিবারের মতো এবারও প্রস্তুত করা হয়েছে মহামায়া দেবী দুর্গাসহ লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক, গণেশসহ বিভিন্ন দেব-দেবীর প্রতিমা। সন্ধ্যায় ভক্ত ও দর্শনার্থীদের জন্য বাহারি সব রং দিয়ে সাজানো হয়েছে এসব প্রতিমা। রং- বেরঙের আলোকসজ্জা আর নানা রঙের ডিজাইনের কাঠামো দিয়ে সাজানো হয়েছে পুরো পূজাঙ্গন।

সিদ্ধেশ্বরী মন্দির, গুলশান-বনানী সর্বজনীন পূজা ও পুরান ঢাকার সব মন্দিরগুলোতে সন্ধ্যারতি, ধূনচী নাচসহ পূজার পাঁচ দিনই থাকছে নানা আনুষ্ঠানিকতা। এ ছাড়া রামকৃষ্ণ মিশন, মিরপুর কেন্দ্রীয় মন্দির, শাঁখারীবাজার, রমনা কালীমন্দির।

পুরান অনুযায়ী, এবার দেবী মর্ত্যে এসেছেন গজে চেপে। পুরাণ অনুযায়ী, দুর্গা গজে চড়ে এলে সুখ ও সমৃদ্ধি বয়ে আনেন। আর ৫ অক্টোবর বিজয়া দশমীতে দেবী মর্ত্য ছাড়বেন নৌকায় চড়ে। নৌকায় গমনেও ধরনী হবে শস্যপূর্ণ তবে থাকবে অতিবৃষ্টি বা বন্যা।

মহাষষ্ঠীর মধ্য দিয়ে শুরু শারদীয় দুর্গোৎসব
                                  

জসিম উদ্দিন তুহিন:
উলুধ্বনি, শঙ্খ, কাঁসর আর ঢাকের বাদ্যিতে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব দুর্গাপূজা শুরু হয়েছে শনিবার ((১ অক্টোবর)) সকাল থেকে। শারদীয় দুর্গোৎসবের আজ মহাষষ্ঠী। বুধবার (৫ অক্টোবর) বিজয়া দশমীতে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হবে পাঁচ দিনের এ মহোৎসব।

বৈশ্বিক মহামারি করোনার প্রাদুর্ভাবে গত দু`বছর অনেকটাই নিষ্প্রাণ ছিল বাঙালি হিন্দুর সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা। আলোকসজ্জাসহ উৎসবসংশ্নিষ্ট বিষয় পরিহার করে কেবল `সাত্ত্বিক পূজায়` সীমিত রাখা হয়েছিল আয়োজন; ছিল বাড়তি সতর্কতা ও স্বাস্থ্যবিধি মানার বিষয়গুলোও। তবে এবার করোনার সংকট ও ভয় কাটিয়ে ফিরে এসেছে চিরচেনা সেই উৎসবের আমেজ। সারাদেশের মণ্ডপ-মন্দিরে বর্ণাঢ্য উৎসবের প্রস্তুতিও এখন শেষ হয়েছে।

এ বছরের দুর্গাপূজার নির্ঘণ্ট অনুযায়ী, আজ শনিবার ষষ্ঠীতে দশভুজা দেবী দুর্গার আমন্ত্রণ ও অধিবাসের মধ্য দিয়ে শুরু হবে পূজার আনুষ্ঠানিকতা। ষষ্ঠী তিথিতে আজ সকাল সাড়ে ৬টার মধ্যে দেবীর ষষ্ঠাদি কল্পারম্ভ ও ষষ্ঠীবিহিত পূজা। সায়ংকালে দেবীর আমন্ত্রণ ও অধিবাসের মধ্য দিয়ে শুরু হবে মূল দুর্গোৎসব। এদিন সকাল থেকে চণ্ডীপাঠে মুখরিত থাকবে সব মণ্ডপ এলাকা। আগামীকাল রোববার মহাসপ্তমী, ৩ অক্টোবর মহাষ্টমী ও কুমারীপূজা এবং ৪ অক্টোবর মহানবমী শেষে ৫ অক্টোবর বিজয়া দশমী ও প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হবে পাঁচ দিনের দুর্গোৎসব।

তবে শুক্রবার পঞ্চমীর সন্ধ্যায় বোধনের মধ্য দিয়ে দেবীর আগমনধ্বনি অনুরণিত হতে শুরু করেছে। সারাদেশের পূজামণ্ডপগুলোতে অনুষ্ঠিত হয়েছে দেবীর বোধন। শারদীয় দুর্গোৎসবের প্রাক্কালে এই বোধনের মাধ্যমে দক্ষিণায়নের নিদ্রিত দেবী দুর্গার নিদ্রা ভাঙার জন্য বন্দনা করা হয়। মণ্ডপে-মন্দিরে পঞ্চমীতে সায়ংকালে তথা সন্ধ্যায় এই বন্দনা অনুষ্ঠিত হয়।

শনিবার সকাল ৮টার দিকে রাজধানীর সিদ্ধেশ্বরী মন্দিরে দেবীর ষষ্ঠাদি কল্পারম্ভের মধ্য দিয়ে শুরু হয় ষষ্ঠীর দিনের পূজা। সিদ্ধেশ্বরী ছাড়াও ঢাকা ও সারা দেশের সব মন্দিরের প্রায় কাছাকাছি সময়ে শুরু হয়েছে ষষ্ঠীপূজার আয়োজন। এ সময় ঢাকঢোলের বাজনা, কাঁসা, শঙ্খের আওয়াজ এবং ভক্তদের উলুধ্বনিতে দেবী দুর্গাকে পৃথিবীতে স্বাগত জানানো হয়। সন্ধ্যায় হবে দেবীর বোধন, আমন্ত্রণ ও অধিবাস। বোধন অর্থ জাগ্রত করা। মর্ত্যে দুর্গার আবাহনের জন্য বোধনের রীতি প্রচলিত রয়েছে।

এদিকে পূজা উপলক্ষে নতুন রূপে সেজে উঠেছে ঢাকেশ্বরী মন্দিরসহ রাজধানীর অন্যসব মন্দির। ঢাকা মহানগরের মধ্যে ভক্ত ও দর্শনার্থীদের প্রধান আকর্ষণ থাকে এই মন্দির। সেই সঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হলের মন্দিরেও দুর্গাপূজায় থাকছে বিশেষ আয়োজন। ঐতিহ্যবাহী বনানী মাঠে আয়োজিত দুর্গা মণ্ডপে সাজানো হয়েছে আরও সুন্দর রূপে।

প্রতিবারের মতো এবারও প্রস্তুত করা হয়েছে মহামায়া দেবী দুর্গাসহ লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক, গণেশসহ বিভিন্ন দেব-দেবীর প্রতিমা। সন্ধ্যায় ভক্ত ও দর্শনার্থীদের জন্য বাহারি সব রং দিয়ে সাজানো হয়েছে এসব প্রতিমা। রং- বেরঙের আলোকসজ্জা আর নানা রঙের ডিজাইনের কাঠামো দিয়ে সাজানো হয়েছে পুরো পূজাঙ্গন।

সিদ্ধেশ্বরী মন্দির, গুলশান-বনানী সর্বজনীন পূজা ও পুরান ঢাকার সব মন্দিরগুলোতে সন্ধ্যারতি, ধূনচী নাচসহ পূজার পাঁচ দিনই থাকছে নানা আনুষ্ঠানিকতা। এ ছাড়া রামকৃষ্ণ মিশন, মিরপুর কেন্দ্রীয় মন্দির, শাঁখারীবাজার, রমনা কালীমন্দির।

পুরান অনুযায়ী, এবার দেবী মর্ত্যে এসেছেন গজে চেপে। পুরাণ অনুযায়ী, দুর্গা গজে চড়ে এলে সুখ ও সমৃদ্ধি বয়ে আনেন। আর ৫ অক্টোবর বিজয়া দশমীতে দেবী মর্ত্য ছাড়বেন নৌকায় চড়ে। নৌকায় গমনেও ধরনী হবে শস্যপূর্ণ তবে থাকবে অতিবৃষ্টি বা বন্যা।

জিপিএ ফাইভ, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় আর বিসিএসের নামই কি সফলতা!
                                  

সুমাইয়া আক্তার


একটা সময় ছিল যখন আমাদের জীবনে পড়াশোনাটাই মূল লক্ষ্য ছিল না। শৈশবের দুরন্তপনায় যখন আমরা মেতে থাকতাম। জীবনে কোন কিছুর প্রতি আমরা কোন চাপ নিতাম না। গ্রামের প্রাইমারি স্কুলে যাওয়া ক্লাস শেষে বাড়ি ফিরে খেলার মাঠে দৌড়। হাসি তামাশা আর রংধনুর মতোই রঙিন জীবন    বেনীআসহকলা`র মত পার করতাম আমরা।

আমাদের বেড়ে ওঠার সাথে সাথে যেন বদলে যেতে থাকলো সেই দুরন্তপনার শৈশব। পরিবর্তন আসতে শুরু করেছে বর্তমান যুগের শিশুদের শৈশবে। ভিন্নতা দেখা দিয়েছে আমাদের সে যুগ আর বর্তমান যুগের শিশুদের জীবন যাপনে।

বর্তমান যুগের শিশুদের জন্মের পরই কেড়ে নেওয়া হয় তাদের সুন্দর শৈশবটাকে। আর নামিয়ে দেয়া হয় এক অসুস্থ প্রতিযোগিতায়। শৈশবের মাঠে হেসেখেলে পার করার দিনগুলোতে তাদের ক্লাস, কোচিং আর প্রাইভেট টিউটরের কাছে উৎসর্গ করতে হয়। এই অসুস্থ প্রতিযোগিতায় তাদের নামিয়ে দিয়ে আমরা ক্ষতিগ্রস্ত করছি তাদের সুস্থ স্বাভাবিক ও সুন্দর জীবনটাকে। জীবনে আসলে পড়ালেখাই মুখ্য বিষয় না। পড়াশোনার পাশাপাশি চিত্তবিনোদনের ও যথেষ্ট দরকার আছে। মানসিক বিকাশের জন্য চিত্তবিনোদন অপরিহার্য। কিন্তু বর্তমান যুগের বাবা-মায়েরা তাদের সন্তানদের ক্ষেত্রে সে সময়টা দিতে চান না। জন্মের তিন বছর পরই তাদের পিঠে চাপিয়ে দেওয়া হয় এক গাদা বই। যার ভার বহন করতে গিয়ে সোনালি শৈশবটাকে মলিন করে তুলতে হচ্ছে ফুলের মতো নিষ্পাপ শিশুদেরকে।

জিপিএ- ৫ নামক এক অসুস্থ সফলতার দিকে হেঁটে চলেছে বর্তমান সমাজ। এখনকার যুগের বাবা-মায়েদের নাকি সম্মান জড়িয়ে থাকে সন্তানদের পরীক্ষায় জিপিএ-৫ রেজাল্টের উপর। কোনোভাবে যদি কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে না পারে তাহলে শুরু হয় কোমলমতি শিশুদের উপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন। আর এগুলো কারা করে? তাদের বাবা-মায়েরা-ই। বর্তমান যুগের বাবা-মায়েরা পড়াশোনার ক্ষেত্রে কোনো সীমাবদ্ধতা মানতে চান না। তারা চান এমন সন্তান যারা সারা দিন-রাত পড়ার টেবিলে বসে পড়ুক। প্রত্যেক বাবা -মা-ই চায় তাদের সন্তান ক্লাসে ফার্স্ট হোক। প্রত্যেকটি পাবলিক পরীক্ষায় যেন জিপিএ-৫ পেয়ে উর্ত্তীণ হয়। আবার কোনো কোনো শিক্ষার্থীকে সাধারণ বৃত্তি কেন পেল, ট্যালেন্টপুলে কেন পেল না তা নিয়েও অনেক অপমান অত্যাচার করা হয়। প্রায়শই খবরের কাগজে দেখা মিলে এমন কিছু মর্মান্তিক ঘটনার যেখানে "জিপিএ-৫ না পাওয়ায় স্কুল শিক্ষার্থীর আত্মহত্যা" এ ধরনের শিরোনাম দেখা যায়।

এই জিপিএ-৫ এর জন্য একের পর এক কোচিং, প্রাইভেট, এক্সট্রা ক্লাসে পাঠানো হয় তাদের। একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের জীবনে ও অবসর থাকে। কিন্তু এখনকার যুগের বাচ্চাদের জীবনে কোনো অবসর থাকে না। খেলাধুলা, ব্যায়াম, ঘুরাঘুরি এগুলো এখনকার বাবা-মাদের মতে সময় নষ্ট। আর এসব করে সময় নষ্ট করার চেয়ে তারা এখন তাদের সন্তানকে পড়ার টেবিলে বসিয়ে রাখতে চায়। তাদের মতে এতে তাদের সন্তান সবার চেয়ে এগিয়ে যাবে। কিন্তু বোকা বাবা-মা একবারও ভেবে দেখে না যে তারা আসলে এভাবে তাদের সন্তানের জীবন ও ভবিষ্যত নষ্ট করছে। ধ্বংস করছে শিশুদের শৈশব, কৈশোরের রঙিন দিনগুলো। বাধা সৃষ্টি করছে শিশুদের মানসিক বিকাশে। জিপিএ-৫ নামক এই অসুস্থ প্রতিযোগিতা চলতে থাকে উচ্চ মাধ্যমিক পর্যন্ত। বাবা-মায়েরা সন্তানদের এক্সট্রা ক্লাস, কোচিং, প্রাইভেট এর জন্য দিয়ে তাদের দিনের বাকি অংশ কেড়ে নেন। এমনকি রাতের বেলায় ও অনেকে তাদের প্রাইভেট টিউটরের কাছে পড়ান। যে কোনো মূল্যেই চাই এক হালি জিপিএ-৫।

উচ্চমাধ্যমিকের পর জিপিএ-৫ এর সেই অসুস্থ প্রতিযোগিতা-ই শেষ নয়। এরপর তাদের সম্মুখীন হতে হয় আরো বড় যুদ্ধের। যার নাম ভর্তি যুদ্ধ। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি সিট সে যেন সোনার হরিণ।দিন দিন এই প্রতিযোগিতায় প্রতিযোগীর সংখ্যা বেড়েই চলেছে। সারা বাংলাদেশের সকল সরকারি মেডিক্যাল, সরকারি, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি এবং প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে সব মিলিয়ে মাত্র ৬৪,০০০ আসন রয়েছে। শিক্ষার্থীদের তুলনায় আসন সংখ্যা খুবই নগণ্য। আর এই সীমিত আসন দখল করার জন্য প্রতিবছর ভর্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করে লক্ষ লক্ষ শিক্ষার্থী। উচ্চমাধ্যমিকের পর ছুটি কাটাবে তো দূরের কথা কলেজে পড়াকালীন সময়েই একাডেমিক পড়াশোনার পাশাপাশি তাদের ভর্তি প্রস্তুতি নেওয়া শুরু করতে হয়। এইচএসসির পর তা শুরু হয় পুরাদমে। একের পর এক প্রাইভেট, কোচিং, বই আর এক গাদা শীটের মাঝেই ডুবে থাকতে হয় সারাদিন। কঠোর পরিশ্রম করার পরও অনেক শিক্ষার্থী কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারে না।

জীবন দিয়ে পড়াশোনা করেও অনেক সময় সবার ভাগ্য সহায় হয় না। যেহেতু শিক্ষার্থীদের তুলনায় আসন সংখ্যা খুবই কম তাই সবাই পরিশ্রম করলেও চান্স পাবে না। কিন্তু এটা আমাদের সমাজ, পরিবার, আত্মীয়-স্বজন মানতে চায় না। তাদের মতে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স না পেলে তার কোনো কোয়ালিটিই নাই। আর যদি শিক্ষার্থী সায়েন্স ব্যাকরাউন্ডের হয় তবে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে সে যত ভালো সাবজেক্ট নিয়েই পড়ুক না কেন সমাজ তাকে মেডিক্যাল, বুয়েট নিয়ে প্রশ্ন করবেই। আত্মীয়-স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশীরা যেন মুখিয়ে-ই থাকে কবে রেজাল্ট বের হবে আর পাশের বাসার ছেলে/মেয়েটা কি রেজাল্ট করলো তা জানতে হবে। আর এসব আত্নীয়-স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশীদের কাছে নিজেদের সম্মান বজায় রাখতে বাবা-মায়েরা এক অসুস্থ প্রতিযোগিতায় বলি দেন তাদের কোমলমতি সন্তানদের।

সত্যি বলতে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় আহামরি কোনো কিছু না। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পেলেই যদি জীবনে সফল হওয়া যেত তাহলে দুদিন পর পর ঢাবি, রাবি, জাবি, ইবি, জবি শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার খবর শোনা যেত না।

প্রাইভেট ও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় পড়েও বর্তমানে অনেক শিক্ষার্থী উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ গড়ে তুলেছেন। বর্তমানে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা স্কিল ও টেকনোলজির দিক দিয়ে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের চেয়ে অনেক এগিয়ে আছে। এমনকি আন্তর্জাতিক মানদণ্ডেও নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি, আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ, ব্রাক ইউনিভার্সিটিসহ আরো অনেক প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি অনেক পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের চেয়ে ভালো অবস্থানে আছে।

এ তো গেল শিক্ষার প্রতিযোগিতা এরপর আসে চাকরির প্রতিযোগিতা। আমার মনে পড়ে আমি যখন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পাই তখনই আমার বড় কাকা আমাকে বলেছিলেন "তোকে কিন্তু বিসিএস দিতেই হবে" বিশ্ববিদ্যালয়ে আসার আগেই আমার মাথায় ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছিল বিসিএসই আমার জীবনের লক্ষ্য। ভার্সিটিতে প্রায়ই ক্লাসে শিক্ষক-শিক্ষিকারা বলেন যে আমাদের ডিপার্টমেন্ট থেকে এত বছরেও নাকি কোনো বিসিএস ক্যাডার বের হতে পারেনি।এ কথাগুলো তারা অনেকটা আক্ষেপ নিয়েই বলেন এবং আশা করেন আমরা যেন বিসিএসে সফলতা অর্জন করে তাদের সম্মান বৃদ্ধি করতে পারি। তখন আমার বলতে খুব ইচ্ছা করে যে, স্যার/ম্যাম আপনারা শুধু এটাই দেখলেন যে আমাদের বিভাগ থেকে কেউ বিসিএস ক্যাডার হতে পারেনি কিন্তু এটা দেখলেন না যে এ বিভাগের কত শিক্ষার্থী কত বড় বড় জায়গায় দায়িত্বরত আছে। তাদের মতে বিসিএসই যেন চূড়ান্ত সফলতা। এছাড়া যেন আর কোনো চাকরির কোনো দাম নেই। বর্তমানের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যেন একেকটা বিসিএস ক্যাডার গড়ার কারখানা হয়ে উঠেছে।

বর্তমান যুগের বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীরা জীবনকে উপভোগ করার বদলে প্রথম বর্ষ থেকেই হাতে এমপি থ্রী নিয়ে ঘুরছে। মনে পড়ে এপিজে আবুল কালাম স্যারের সেই বিখ্যাত উক্তি, "যতদিন শিক্ষার উদ্দেশ্য শুধু চাকরি পাওয়া হবে ততদিন সমাজে চাকররা জন্মাবে মালিক নয়।" সত্যিই এখন আমরা ভুলে গেছি যে শিক্ষার আসল উদ্দেশ্য জ্ঞান অর্জন, মনুষত্ববোধ জাগ্রতকরণ, সুনাগরিক হওয়া। তা ভুলে আমরা এখন মুখস্থবিদ্যার অসুস্থ প্রতিযোগিতায় মেতে উঠেছি।

ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে এই অসুস্থ প্রতিযোগিতা থেকে বাঁচাতে আমাদের সকলের এখনই সোচ্চার হওয়া উচিত। জীবন তো একটাই সে এক জীবনকে নরকের বদলে উপভোগ্য করে তুলতে আমাদের সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টার প্রয়োজন। শিশুদের পর্যাপ্ত মানসিক বিকাশের জন্য পড়াশোনার পাশাপাশি পর্যাপ্ত খেলাধুলা, শরীরচর্চা ও ভ্রমণে সময় দেওয়া উচিত। শিশুদের উপর কোন চাপ সৃষ্টি না করে তাদের মতামতকেও যথেষ্ট গুরুত্ব দেয়া উচিত। তবেই ঘটবে মানসিক বিকাশ জাগৃত হবে মনুষ্যত্ববোধ এবং জীবন হবে সুন্দর ও উপভোগময়।

লেখক: সুমাইয়া আক্তার
শিক্ষার্থী গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।

 

আমাদের সংস্কৃতির সঙ্গে মৃৎশিল্প
                                  

জসিমউদ্দিন তুহিন
প্রতিটি জাতির রয়েছে নিজস্ব শিল্প ও সংস্কৃতি। একেকটি শিল্পের বিস্তারের পেছনে রয়েছে দেশ বা জাতির অবদান। আমাদের দেশের অন্যতম শিল্প হচ্ছে মৃৎশিল্প। আমাদের সংস্কৃতির সঙ্গে মৃৎশিল্পের সম্পর্ক অনেক গভীর। ‘মৃৎ’ শব্দের অর্থ মৃত্তিকা বা মাটি আর ‘শিল্প’ বলতে এখানে সুন্দর ও সৃষ্টিশীল বস্তুকে বোঝানো হয়েছে। এজন্য মাটি দিয়ে দিয়ে তৈরি সব শিল্পকর্মকেই মৃৎশিল্প বলা যায়। প্রাচীনকাল থেকে বংশানুক্রমে গড়ে ওঠা গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী মৃৎশিল্প আজ বিলুপ্তির পথে। আজকাল কুমারপাড়ার মেয়েদের ব্যস্ততা অনেক কমে গেছে। কাঁচামাটির গন্ধ তেমন পাওয়া যায় না। হাটবাজারে আর মাটির তৈজসপত্রের পসরা বসে না। তবে নির্মম বাস্তবতার সঙ্গে যুদ্ধ করে এখনো কিছু জরাজীর্ণ কুমার পরিবার ধরে রেখেছেন বাপ-দাদার এই ব্যবসায়।

 

মৃৎশিল্পের সঙ্গে চীনের বড় একটা ঐতিহ্য আছে। বিভিন্ন মাধ্যম থেকে জানা গেছে চীনের বিখ্যাত শহর থাংশান-এ মৃৎশিল্পের জন্ম হয়েছিল। আর এ কারণেই এ শহরটিকে মৃৎশিল্পের শহর বলা হয়। চীনের অন্যতম প্রাচীন শহর পেইচিং থেকে ১৫০ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে অবস্থিত এই শহরটি। এই শহরের পথে-প্রান্তরে, বিনোদন কেন্দ্র বা পার্কগুলোতে মৃৎশিল্পের বিভিন্ন শিল্পকর্ম দেখতে পাওয়া যায়। থাংশানের মৃৎশিল্পের উৎপত্তি ও বিকাশের সূত্রপাত মিং রাজবংশের ইয়ুং লে-এর সময়কালে। এ শহরের রয়েছে প্রায় ৬০০ বছরের ইতিহাস। এখানে নানা ধরনের চীনামাটির ৫০০টিরও বেশি মৃৎশিল্প রয়েছে। এখানকার বিভিন্ন রকম মাটির মধ্যে প্রাচীন স্থাপত্য চীনামাটি, স্বাস্থ্যসম্মত চীনামাটি, শিল্পায়ন চীনামাটি, হাইটেক চীনামাটি, শিল্পকলা চীনামাটি ইত্যাদি অন্যতম। বিভিন্ন দোকানে গিয়ে অনেক ক্রেতা এখনো চীনের তৈরি জিনিসপত্র খোঁজ করেন।

 

চীনা শিল্পের যেমন ঐতিহ্য আছে, ঠিক তেমনি আমাদের দেশেরও আছে। শত শত বছর ধরে এই শিল্পের সঙ্গে হাজার হাজার মানুষ জড়িত আছেন। আমাদের দেশে এই ধরনের কাজের সঙ্গে যারা জড়িত তাদেরকে আমরা কুমার বলি। অতীতে গ্রামের সুনিপুণ কারিগরের হাতে তৈরি মাটির জিনিসের কদর ছিল অনেকাংশ বেশি। পরিবেশ বান্ধব এ শিল্প শোভা পেত গ্রামের প্রত্যেক বাড়িতে বাড়িতে। আধুনিকতার ছোঁয়া লেগে আজ তা হারিয়ে যেতে বসেছে। মাটির তৈরি কলসি, ফুলের টব, সরা, বাসন, সাজের হাঁড়ি, মাটির ব্যাংক, শিশুদের বিভিন্ন খেলনাসমগ্রী নানা ধরনের তৈজসপত্র তৈরি করত কুমারেরা। এ শিল্পের প্রধান উপকরণ এঁটেল মাটি, জ্বালানি কাঠ, শুকনো ঘাস, খড় ও বালি।

 

আমাদের দেশে এই শিল্পের ব্যবহার সেই আদিকাল থেকে। পোড়ামাটির নানাবিধ কাজ, গৃহস্থালির নিত্যব্যবহার্য দ্রব্যাদি, পুতুল, খেলনা, প্রতিমা, প্রতিকৃতি, টপ, শো-পিসসহ অসংখ্য জিনিস আজও কুমারশালায় তৈরি হয়ে ক্রেতাদের চাহিদা মেটাচ্ছে। কথিত আছে, কাউকে মাটির তৈরি হাঁড়ি কিংবা গণেশের মূর্তি দিলে বিনিময়ে ওই পাত্রে বা মূর্তির পেটে যত চাল ধরে ততটাই দেওয়া হতো শিল্পীকে। মাটির তৈরি বিভিন্ন রকমারি আসবাবপত্র চেয়ার, টেবিল ইত্যাদি আজ প্রচুর চাহিদা লক্ষণীয়। তাছাড়া মেয়েদের বিভিন্ন মাটির তৈরি গয়না সহজেই চোখে পড়ে দেশের মেলাগুলোতে এছাড়া বিভিন্ন দোকানে।

 

আধুনিকতার ছোঁয়া লেগে আজ মাটি দিয়ে প্রস্তুত অনেক কিছুই হারিয়ে যেতে বসেছে। তার পরও অনেক সংগ্রাম করে পোড়ামাটির গৃহস্থালির নিত্যব্যবহার্য দ্রব্যাদি, পুতুল, খেলনা, প্রতিকৃতি, শো-পিসসহ অসংখ্য জিনিস কুমারশালায় তৈরি হচ্ছে। পূর্বপুরুষদের রেখে যাওয়া পেশা টিকিয়ে রাখতে হিমশিম খেতে হচ্ছে কুমারদের। এ সম্প্রদায়ের লোকজনেরা মাটির তৈরি করা পাকপাতিল, ঠিলা, কলসি, পুতুল, কুয়ার পাট, খেলনার সামগ্রী, ফুলের টব, মাটির ব্যাংক ইত্যাদি হাটবাজারে বা গ্রামে গ্রামে বড় ঝাঁকা বোঝাই করে ঘুরে ঘুরে বিক্রি করতেন। ছয় মাস ধরে তারা মৃৎশিল্প তৈরি করে আর ছয় মাস বিভিন্ন কায়দায় বিক্রি করতেন।

 

মৃৎশিল্প আমাদের অর্থনীতিতে বিশেষ অবদান রাখছে। ২০০০ সালের পর বেড়ে যায় রফতানি। এখন ইউরোপ ও আমেরিকা ছাড়াও নিউজিল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া ও কানাডায় রফতানি হচ্ছে বাংলাদেশের পণ্য। রফতানির ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করছে ভারত, ফিলিপাইন ও ভিয়েতনাম। বিদেশে মূলত মাটির তৈরি পামিজ, ফুলের টব, বিভিন্ন ধরনের গার্ডেন প্রডাক্ট, নাইট লাইট, ডাইনিং আইটেম, ইনডোর গার্ডেন আইটেম, ফুলদানি, মাটির টব ও মাটির ব্যাংকের চাহিদা আছে। ব্যাপক ভিত্তিতে মাটির তৈরি জিনিস রপ্তানি করা গেলে আরো বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা যেত।

 

বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী শিল্পগুলোর অন্যতম হচ্ছে মৃৎশিল্প। এটি শুধু শিল্প নয়, আবহমান গ্রামবাংলার ইতিহাস ও ঐতিহ্য। মাটির নান্দনিক কারুকার্য ও বাহারি নকশার কারণে এই শিল্পের প্রয়োজনীয়তা অনুধাবন করে যাতে বাইরের রাষ্ট্রে রপ্তানি করা যায় তার জন্য আরো বেশি করে উদ্যোগ নিতে হবে। মৃৎশিল্পের সঙ্গে জড়িত কুমার এবং পালদের সহজ শর্তে ঋণ এবং অন্যান্য সুযোগসুবিধা প্রদানের মাধ্যমে বিভিন্নমুখী উৎপাদন বাড়াতে হবে। এই দেশীয় শিল্পের সমৃদ্ধির লক্ষ্যে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে ।

 

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট

কেন ভর্তি হবেন ফিন্যান্স ও ব্যাংকিং বিভাগে
                                  

চন্দন কুমার পাল


উচ্চ মাধ্যমিকের পরেই শিক্ষার্থীদের উচ্চতর শিক্ষা অর্জনের জন্য আলাদা আলাদা বিষয়ে স্নাতক এবং স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করতে হয়।ফিন্যান্স এন্ড ব্যাংকিং বিভাগ ব্যবসায় প্রশাসন অনুষদের শীর্ষে থাকা বিষয়গুলোর মধ্যে অন্যতম।পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদে ভর্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে যারা মেধা তালিকায় প্রথম সারিতে অবস্থান করে তাদের মধ্য থেকে কিছু নির্দিষ্ট শিক্ষার্থীরা ফিন্যান্স এ পড়ার সুযোগ পেয়ে থাকে।প্রতিযোগীতার এ যুগে ভালো মানের বিষয় পাওয়া যেনো আরেকটি বড় প্রতিযোগীতা। কারন ভালো বিষয়ের উপর ভালো ক্যারিয়ার অনেকটা নির্ভরশীল।

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০১০ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় ফিন্যান্স এন্ড ব্যাংকিং বিভাগ।বিভাগটিতে বর্তমানে মোট ১০জন শিক্ষক রয়েছে।বিভাগের শিক্ষগণ অত্যন্ত দক্ষতার সাথে পাঠদান সম্পন্ন করেন।প্রত্যেকটি শিক্ষকই বাংলাদেশের নামকরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা করে এসেছেন এবং অনেকেই দেশের বাইরে থেকে পিএইচডি ডিগ্রী অর্জন করেছেন এবং করছেন।বর্তমানে ভালো ক্যারিয়ার গড়ার জন্য ফিন্যান্স এন্ড ব্যাংকিং বিভাগে পড়ার গুরুত্ব অপরিহার্য।


উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা শেষ করার পর ছাত্র-ছাত্রীরা ভর্তি হয় বিশ্ববিদ্যালয়ে তাদের স্নাতক ডিগ্রীর জন্য। প্রতিযোগিতামূলক ভর্তি পরীক্ষায় ঊত্তীর্ণ হয়ে অনেকেই স্নাতক পড়ার বিষয় নির্ধারণ করতে দ্বিধাদ্বন্দে পড়ে যায়। ছাত্র-ছাত্রীদের স্নাতক বিষয় নির্ধারণ সহজতর করার লক্ষ্যে এই লেখা।

ফিন্যান্স বিষয়টি মূলত বিভিন্ন বিশ্লেষণের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে সহায়তা করে। এই বিষয়টি বিভিন্ন গাণিতিক বিশ্লেষণ ও তত্ত্বের (থিওরির) সাহায্যে ব্যবহারিক জীবনে যৌক্তিক সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে সাহায্য করে।

প্রতিটি কোর্সে মাল্টিমিডিয়া প্রেজেন্টেশন থাকার দরুন উপস্থাপন করার জড়তা ও ভয় কাটবে। কোর্সের সমাপ্তিতে বাস্তব জীবনে থিওরির প্রয়োগের জন্য বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের উপর প্রতিবেদন তৈরি করতে হয়। ফিন্যান্স ও ব্যাংকিং বিষয়ে পড়ার সুবাদে দেশের অর্থনীতি, শেয়ার বাজার, শিল্পায়ন, ব্যাংকিং ব্যবস্থা এবং আয়কর, বাজেট ইত্যাদি সম্পর্কে সুদৃঢ় জ্ঞান অর্জন হবে। গাণিতিক বিষয়গুলিতে দক্ষ হলেই কেবল ফিন্যান্স ও ব্যাংকিং বিষয়ে পড়া সহজতর মনে হবে।

ফিন্যন্স ও ব্যাংকিং বিষয়ে বি.বি.এ. ডিগ্রি অর্জন করলে ব্যাংক, বীমা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের চাকরিতে অগ্রাধিকার পাওয়া যায়। বি. সি. এস.- এ সকল ক্যাডারের পাশাপাশি বি. সি. এস. শিক্ষা - ফিন্যান্স এন্ড ব্যাংকিং (প্রভাষক) পদে শুধুমাত্র ফিন্যান্স ও ব্যাংকিং বিভাগের ছাত্র-ছাত্রীরাই আবেদন করতে পারে। এছাড়া স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানগুলোর সহকারী পরিচালক ( অর্থ) পদে শুধুমাত্র ফিন্যান্স ও ব্যাংকিং বিভাগের ছাত্র-ছাত্রীরাই আবেদন করার সুযোগ থাকে। দেশীয় সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানে ( এম.এন.সি.) চাকুরির সুযোগ রয়েছে।

বিদেশে ফিন্যান্স ও ব্যাংকিং বিষয়ে উচ্চতর ডিগ্রির ক্ষেত্রে স্কলারশিপ পাওয়ার সম্ভবনা বেশি থাকে। শুধুমাত্র ফিন্যান্স ও ব্যাংকিং- এ স্নাতক ডিগ্রীধারীরা প্রফেশনাল ডিগ্রি সি.এফ.এ. গ্রহণ করতে পারে। এছাড়া, সি. এ., এ. সি. সি.এ., এ্যাকচুয়ারী, সি. এস. প্রফেশনাল ডিগ্রি অর্জনের পথও সহজ হয় এবং রেয়াত (এ্যাকজিমশন) পাওয়া যায়।

শেয়ার বাজারের বোকারেজ হাউজে, মিউচুয়াল ফান্ডের অফিসে, ক্রেডিট রেটিং প্রতিষ্ঠানে, ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকে, এ্যাসেট ম্যানেজম্যান্ট কোম্পানিতে এ্যানালিস্ট হিসেবে শুধুমাত্র ফিন্যান্স ও ব্যাংকিং এর গ্রাজুয়েট রিক্রুয়েট করা হয়।

ফিন্যান্স ও ব্যাংকিং বিষয়ে পড়ার দরুন কম্পিউটারে দক্ষ হওয়া ছাড়াও বিশেষ করে স্পেডশিট ( মাইক্রোসফট এক্সেল) ব্যবহারে দক্ষ হওয়ার সুযোগ রয়েছে।
সর্বোপরি, ফিন্যান্স ও ব্যাংকিং বিষয়ে পড়লে আপনি নিজেকে এই প্রতিযোগিতামূলক চাকুরির বাজারে নিজেকে একজন দক্ষ মানবসম্পদ হিসেবে গড়ে তুলার সুযোগ তো থাকছেই।

লেখক,শিক্ষক, সহকারী অধ্যাপক, ফিন্যান্স এন্ড ব্যাংকিং বিভাগ
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়।

বাংলাদেশ ও জ্বালানি তেল
                                  

জসিমউদ্দিন খান তুহিন
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো এ ইঙ্গিতও দিচ্ছে, যথেষ্ট সক্ষম ও শক্তিশালী বিকল্প উৎস তৈরি না করা পর্যন্ত বর্তমান জ্বালানি ব্যবস্থাকে বিচ্যুত করাটা অর্থনীতি ও জলবায়ু উভয় অগ্রগতিকে বড় ধরনের ঝুঁকির মধ্যে ফেলতে পারে এবং আমরা সবার জন্য একটি ন্যায়সংগত ও ন্যায্য পরিবর্তন নিশ্চিত করতে পারি কিনা তা নিয়েও প্রশ্ন রাখছে।

অর্থনীতি ও জলবায়ুবিষয়ক অগ্রগতি অর্জনে জ্বালানির সফল রূপান্তর জরুরি। তবে তা অবশ্যই বিজ্ঞানসম্মত, অর্থনৈতিক এবং প্রকৌশল তথ্যের ওপর ভিত্তি করে হতে হবে। পাশাপাশি বিবিধ দ্বিধা ও চ্যালেঞ্জগুলোকে আমলে নিয়ে ব্যবহারিক সমাধানের দিকেও জোর দিতে হবে। সেজন্য আমাদের প্রয়োজন অন্তর্ভুক্তিমূলক পদ্ধতি, যা সমাজের সব ক্ষেত্রের অভিজ্ঞতাগুলো কাজে লাগাবে, আর অবশ্যই জ্বালানি খাতকে বাদ দেবে না।

কভিড-১৯ মহামারী-পরবর্তী অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়ার ফলে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সংকট শুরু হয়েছে। এর মধ্যে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ জ্বালানি বাজারকে আরো সংকটের দিকে ঠেলে দেয়। রাষ্ট্রগুলো এখন তাদের নিকটবর্তী জরুরি কৌশলগত চাহিদার পুনরায় মূল্যায়ন করতে বাধ্য হচ্ছে। এ অবস্থায় সরকারগুলোর জন্য পরিষ্কার বার্তাটি হচ্ছে, পর্যাপ্ত বিকল্প উৎস তৈরি ব্যতীত তাড়াহুড়ো করে হাইড্রোকার্বন থেকে সরে আসার সিদ্ধান্তটি মোটেও ভালো কিছু হবে না, বরং যথেষ্ট প্রস্তুতি ছাড়া এ ধরনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলে তা জ্বালানি নিরাপত্তাকে বিঘ্নিত, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নষ্ট এবং জ্বালানির রূপান্তর কার্যক্রমকে ত্বরান্বিত করতে প্রয়োজনীয় বিনিয়োগকে নিরুৎসাহিত করবে। এখানে যা প্রয়োজন তা হচ্ছে বাস্তবসম্মত নতুন কৌশল গ্রহণ—যা হবে ব্যবহারিক, প্রবৃদ্ধির পক্ষে ও জলবায়ু সমর্থক।

গৃহীত কৌশলে জ্বালানি ও শিল্প ব্যবস্থার জটিলতাগুলোকেও ধারণ করতে হবে। প্রয়োজনীয় রূপান্তর প্রক্রিয়ার জন্য মূলধন বরাদ্দ থেকে শুরু করে পণ্যের নকশা, জননীতি এবং আচরণগত পরিবর্তন সবকিছুতেই বৃহত্তর প্রান্তিকরণ ও সহযোগিতা প্রয়োজন হবে। এর মানে জ্বালানি ব্যবস্থার চাহিদার দিকটি পরীক্ষা করা। বায়ু ও সৌরশক্তিতে বড় ধরনের অগ্রগতি হয়েছে কিন্তু বেশির ভাগ শক্তিই ব্যবহূত হচ্ছে ভারী শিল্প, উৎপাদন কার্যক্রম, নির্মাণকাজ, পরিবহন ও কৃষিতে। এ ধরনের হালকা থেকে ভারী শিল্প খাতও জলবায়ুর ওপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলছে। তাই এখন থেকেই এ খাতগুলোতে আরো বেশি বিনিয়োগ করা প্রয়োজন।

গত বছর নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বৈশ্বিক বিনিয়োগের পরিমাণ ৩৬৫ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেলেও শক্তি সঞ্চায়ন, কার্বন ক্যাপচার এবং হাইড্রোজেন ভ্যালু চেইনে সম্মিলিত বিনিয়োগ ছিল মাত্র ১২ বিলিয়ন ডলার, যা যথেষ্ট নয়। মনে করা হচ্ছে, জ্বালানি রূপান্তরের জন্য আগামী ৩০ বছরে ২৫০ ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি বিনিয়োগ প্রয়োজন হবে। আর অবশ্যই একক কোনো কোম্পানি ও একক কোনো রাষ্ট্রের পক্ষে এ পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ সম্ভব হবে না।

তাছাড়া অর্থায়নই এখানে একমাত্র বিষয় নয়। জ্বালানির রূপান্তর প্রক্রিয়ার জন্য সময় প্রয়োজন। ২০২১ সালে নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদনের বেশির ভাগই এসেছে বায়ু ও সৌরশক্তি থেকে। তবে এটি এখনো জ্বালানির প্রত্যক্ষ ব্যবহারের (এনার্জি মিক্স) মাত্র ৪ শতাংশ। এদিকে বিশ্বে বিদ্যুতের চাহিদা যেভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে, তাতে বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তা বজায় রাখার জন্য আগামী কয়েক বছর তেল ও গ্যাসকে এনার্জি মিক্সের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ হিসেবে থাকতে হবে।

 

বিদ্রোহী কাজী নজরুল
                                  

সাজ্জাদ আলম খান সজল
কাজী নজরুল ইসলামের অনবদ্য সৃষ্টি বাংলা ভাষাকে অনন্য রূপশ্রীতে বিকশিত করেছে। বাংলা সাহিত্যের ধূমকেতুও বলা হয় এই কবিকে । বাংলা ভাষার অভিধানমঞ্জুরীসমূহকে বিদ্রোহী শব্দরাশির সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়ে তিনি বাংলা ভাষাকেই অনন্য রূপে ভূষিত করেছেন। তাঁর অনন্যসাধারণ সৃষ্টি ভারত ও বাংলাদেশে এক অখণ্ড ও অবিভাজ্য মহিমায় বিধৃত হয়ে আছে। নজরুলের জীবন গতানুগতিক সাধারণ মানুষের মতো ছিল না। কবিতার মতোই তাঁর জীবন ছিল ঝঞ্জার মতো উদ্দাম,দুর্নিবার,দুর্বিনীত। বাধাঁ বন্ধনহীন হয়ে তিনি ছুটে বেড়াতেন বাংলার এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্ত। বাধঁনহারা জীবনের সমস্ত পাওয়া না পাওয়ার বেদনাই তাঁর সৃষ্টিকে বৈচিত্র্যে ভরে তুলেছিল। তৈল মাখা ক্ষুদ্র তনু ও নিদ্রারসে ভরা কোমলকান্ত নিস্তেজম্লান জীবনে নূতন উদ্দীপনা ও উৎসাহের সঞ্চার করে তিনি মানুষকে মুক্তজীবনের ডাক শুনিয়েছিলেন।

তার চেহারাই নজরুল-প্রতিভার একটি বিশিষ্ট পরিচয় বহন করে । যৌবনে নজরুলের গায়ের রঙ ছিল উজ্জ্বল শ্যামবর্ণ। চেহারায় ছিল আর্যের লক্ষণ। হাঁটার সময় তার মাথার কোঁকড়ানো চুলগুলি নাচত। তার লেখা বিদ্রোহীভাবাত্মক গান ও কবিতাগুলি যেন মূর্ত হয়ে উঠত বলিষ্ঠ সুগঠিত দেহে।

১৩৩০ সালের (১৯২৩) আশ্বিন মাসের `কল্লোলে’ নজরুলের সম্বন্ধে একটি পরিচয় লিপি প্রকাশিত হয়। এ সময় তার বয়স ছিল ২৪ বৎসর।

“কবি নজরুল ইসলাম—বলিষ্ঠ সুগঠিত দেহ, মাথায় বড় বড় ঝাঁকড়া চল, গোঁফ আছে, বিদ্রোহীর মতই উৎসাহে উজ্জ্বল চোখ। চোখ দুটি যেন পেয়ালা, কখনো সে পেয়ালা খালি নেই, প্রাণের অরুণ রসে সুদই ভরপুর। গলাটি সারসের মতো পাতলা নয়, পুরুষের গলা যেমন হওয়া উচিত তেমনি সবল, বীর্য-ব্যঞ্জক। গলার স্বর ভারী, কিন্তু সেই মোটা গলার সুরে আছে যাদু । ঢেউয়ের আঘাতের মতো, ঝড়ের ঝাপটার মতো তার গান আছড়ে পড়ত শ্রোতার বুকে। অনেক চিকন গলার গাইয়ের চেয়ে নজরুলের মোটা গলার গান লক্ষগুণ ভালো লাগত। ... প্রবল হতে সে ভয় পেত না, নিজেকে মিঠে দেখাবার জন্যে সে কখনো চেষ্টা করত না। রবীন্দ্রনাথের পরে এমন শক্তিশালী কবি আর আসেনি বাঙলা দেশে। ”

প্রতিভা সোম ঢাকায় নজরুলের কাছে গান শিখেছিলেন। নজরুল তার বিখ্যাত গানের বই চোখের চাতক প্রতিভা সোমকে উৎসর্গ করেন। উৎসর্গে লেখা হয় কল্যাণীয়া বীণা-কন্ঠী শ্রীমতী প্রতিভা সোম জয়যুক্তাসু। পরে বুদ্ধদেব বসুর সঙ্গে প্রতিভা সোমের বিবাহ হয়। স্মৃতিচারণে ঢাকায় দেখা নজরুল সম্পর্কে প্রতিভা সোম লিখেছেন,
“থাকি ঢাকা শহরে, বয়স তখন তের... নজরুল ইসলামের বয়স তখন তিশ-বত্রিশ অথবা তারও কিছু বেশী কিনা আমি জানি না। যৌবন তার চোখে মুখে সমস্ত শরীরে নদীর স্রোতের মত বহমান ও বেগমান। সেই বয়সে তাকে যারা দেখেছেন শুধু তাদেরই বোঝানো যাবে কী দুকূলপ্লাবী আনন্দধারা দিয়ে গড়া তার চরিত্র। ... এই ব্যক্তিটি নানা কারণেই তাই নানা মানুষের কাছে এক কল্পনার নায়ক। বস্তুত এমনই একজন নায়ক কোন দেশে কোন কালেই অবিরল নয়। মস্ত বড়ো বড়ো টানা কালো চোখ, এলোমেলো ঘন চুলের বাবরি, তীক্ষ্ণ নাসিকা, ঘষা তামার মতো রং, লাবণ্য সহজ সরল অদাম্ভিক ব্যবহার, উদ্দাম হাসি, উচ্ছ্বাস প্রবণতা—সবটা মিলিয়ে একটা ব্যক্তিত্ব বটে। আর তার লাটিয়ে পড়া গেরুয়া চাদর।”

সাহিত্য সঙ্গীত ছাড়াও নজরুলের বিচরন ছিল প্রায় সকল ক্ষেত্রেই। রাজনীতি, সভাসমিতি,খেলার মাঠে, রঙ্গরসে ব্যঙ্গৰিদূপে সবখানেই তিনি ছিলেন সেরার সেরা। উনবিংশ শতাব্দীর লাঞ্চনা শোষন নিপীড়েনের বিরুদ্ধে নজরুল ছিলেন বিংশ শতাব্দীর কোলে জন্ম নেয়া এক শ্রেষ্ঠ উপহার।

নজরুলের প্রকৃতি সম্পর্কে বুদ্ধদেব বসু যা বলেছেন তা সবিশেষ প্রণিধানযোগ্য।

“দেহের পাত্র ছাপিয়ে সব সময়েই উছলে পড়েছে তার প্রাণ, কাছাকাছি সকলকেই উজ্জীবিত করে মনের যত ময়লা, যত খেদ, যত গ্লানি সব ভাসিয়ে দিয়ে। সকল লোকই তার আপন, সব বাড়িই তার নিজের বাড়ি। শ্রীকৃষ্ণের মতো, তিনি যখন যার—তখন তার। জোর করে একবার ধরে আনতে পারলে নিশ্চিন্ত, আর ওঠবার নাম করবেন না—বড়ো-বড়ো জরুরি এনগেজমেন্ট ভেসে যাবে।...হয়তো দু’দিনের জন্যে কলকাতার বাইরে কোথাও গান গাইতে গিয়ে সেখানেই একমাস কাটিয়ে এলেন; সাংসারিক দিক থেকে এ-চরিত্র আদর্শ নয়, কিন্তু এ-চরিত্রে রম্যতা আছে তাতে সন্দেহ কী। সেকালে বোহেমিয়ান চাল-চলন অনেকেই রপ্ত করেছিলেন—মনে-মনে তাদের হিসেবের খাতায় ভুল ছিল না। জাত-বোহেমিয়ান এক নজরুল ইসলামকেই দেখেছি। অপরূপ তার দায়িত্বহীনতা।”

নজরুল-চরিত্রের সর্বজনীনতা তার সৃষ্টিকেও সর্বজনীন করে তুলেছিল। সাধারণ মানুষের মনের কথাগুলো সাহসের ফুল হয়ে পরাধীন দেশবাসীর নিকট আবিভূর্ত হয়। সাহসের ফুল যখন শাসককে হুল ফুটাতে শুরু করলো তখন তার কলম কেঁড়ে নিয়ে বদ্ধ করা হলো কারা প্রকোস্টে। নজরুল বজ্রযোগী সন্ন্যাসীর মতো সত্যের সাধন করেছেন বলেই অমরতার স্বীকৃতি পেয়েছেন।

বিদ্রোহী নজরুল জীবনে কারোর কাছে মাথা নত করেন নি। মৃত্যর কাছেও তিনি নতি স্বীকার করেননি। তিনি তাঁর জীবনের সমস্ত ধ্যান ও জ্ঞান দিয়ে যৌবনের বন্দনা করে গেছেন। নিপীড়িত, প্রবঞ্চিত ও পরাধীন মানুষের প্রতিনিধি হয়ে নজরুল শাসন ও শোষণের বিরুদ্ধে পরিচালিত সংগ্রামে তার মানব জীবন উৎসর্গ করে গেছেন।
লেখক: সাংবাদিক সাহিত্যিক

চা শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি ও মানবাধিকার প্রদান করতে হবে
                                  

আরিফা আক্তার
চা-শিল্পের উন্নতি হলেও বদলাচ্ছে না চা-শ্রমিকদের জীবন। শ্রম শোষণের শিকার হয়ে আসছে ব্রিটিশ আমল থেকে আজ অবধি। সারাদিন কাজের পর একজন চা-শ্রমিকের আয় হয় ১২০ টাকা। দ্রব্যমূল্য পাল্লা দিয়ে বাড়লেও সেভাবে বাড়ে না তাদের বেতন। নেই নিজস্ব নৃতাত্ত্বিক জাতিগত পরিচয়। লেখাপড়ার সুযোগ নেই। নেই স্যানিটেশন ব্যবস্থাও। রয়েছে চিকিৎসার অভাব। কাজ করতে গিয়ে অঙ্গহানি ঘটলেও কোনো সাহায্য নেই। সাত ফুট বাই ১৪ ফুট ঘরে পরিবারপরিজন নিয়ে মানবেতর বসবাস করতে হয়।

পাঁচ-ছয় সদস্যের অনেক পরিবার আছে যেখানে একজন কাজ করে পাচ্ছে ১২০ টাকা আর বাকিদের ওই টাকার ওপর নির্ভর করেই দিন পাড়ি দিতে হয়। ছোট ভাঙাচোরা ঘরে থাকতে হয় গবাদিপশুসহ সন্তানদের নিয়ে। বাগান কর্তৃপক্ষের ঘর মেরামত করে দেয়ার কথা থাকলেও তা হয় না বছরের পর বছর। তাদের নেই নিজস্ব কোনো জায়গা। বাগানে কাজ না করলে থাকার জায়গা হারানোর ভয়। এভাবে নানা বঞ্চনা দুঃখ দুর্দশার মধ্যে কাটছে বাংলাদেশের চা-শ্রমিকদের জীবন।

এতদঞ্চলে প্রথম বাণিজ্যিকভাবে চা উৎপাদন শুরু হয়েছিল ১৮৫৪ সালে, সিলেটের মালনীছড়ায়। সে সময় চা শিল্পকে বিকশিত করতে ব্রিটিশ সরকার ভারতের ওড়িশা, ঝাড়খন্ড, উত্তরপ্রদেশসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে দরিদ্র আদিবাসীদের ট্রেনযোগে সিলেট অঞ্চলে নিয়ে আসে। ভূমিসহ নানা সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে তাদের নিয়ে আসা হলেও বাস্তবে তার প্রায় কিছুই জোটেনি। দেশের ১৬২টি চা বাগানের মধ্যে ১৩৭টিই রয়েছে সিলেট বিভাগে এবং এখানে কর্মরত চা-জনগোষ্ঠীর সংখ্যা প্রায় ৭ লাখ। স্বল্পমজুরি ও সব ধরনের নাগরিক সুবিধাবঞ্চিত থাকায় জীবনমানের সব সূচকেই পিছিয়ে রয়েছেন চা শ্রমিকরা।

অভিযোগ রয়েছে, প্রতি বছর নতুন মজুরি বাস্তবায়নের কথা থাকলেও বিগত ১৯ মাসেও নতুন মজুরি নির্ধারণ হয়নি চা শ্রমিকদের। মজুরি বাড়ানোর দাবিতে আন্দোলন করছেন চা শ্রমিকরা। মালিকপক্ষ বর্তমান মজুরির সঙ্গে ১৪ টাকা যোগ করে মোট ১৩৪ টাকা করার প্রস্তাব দিলে সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে চা শ্রমিকরা দৈনিক ৩০০ টাকা মজুরির দাবিতে অনড় রয়েছেন। এ ক্ষেত্রে শ্রমিক নেতৃবৃন্দের ভাষ্য হচ্ছে, ১২০ টাকা মজুরিতে জীবনযাপন করা কষ্টসাধ্য; উপরন্তু প্রতিদিন অনূন্য ২৩ কেজি চা পাতা তুলতে না পারলে প্রাপ্য ১২০ টাকাও শ্রমিকদের দেওয়া হয় না।

বস্তুত এ অঞ্চলে চা শিল্পের শুরু থেকেই বঞ্চনার শিকার হয়ে আসছেন শ্রমিকরা। দূরদূরান্ত থেকে নিয়ে আসা শ্রমিকদের কঠোর পরিশ্রমে বুনো টিলায় চা বাগানগুলো গড়ে উঠলেও শোষণ-বঞ্চনা থেকে মুক্তি মেলেনি তাদের। দুঃখজনক হলো, একুশ শতকের এই সময়ে এসেও চা শ্রমিকদের ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন হয়নি। তাদের ঘরবাড়ি খুবই নিম্নমানের। কারোরই ভূমির অধিকার নেই। তাদের খাটানো হয় অত্যধিক; কিন্তু মজুরি দেওয়া হয় খুবই সামান্য। অশিক্ষা, অপুষ্টি, দারিদ্র্য এসবের সঙ্গে তাদের নিত্য বসবাস। চা বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ অর্থকরী ফসল।

বিগত তিন দশক ধরে চায়ের অভ্যন্তরীণ চাহিদা বেড়েছে ব্যাপকভাবে। সঠিকভাবে তদারকি করতে পারলে চা শিল্প দেশের অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে, তা বলাই বাহুল্য। এক্ষেত্রে সরকারকেই ভাবতে হবে বেশি। অপার সম্ভাবনাময় চা শিল্পের বিকাশে যেসব প্রতিবন্ধকতা রয়েছে, তা দূর করে শিল্পটিকে যুগোপযোগী ও প্রত্যাশিত মানে উন্নীত করার পাশাপাশি শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার ও জীবনমানের উন্নয়ন ঘটাতে পারলে চা শিল্প উন্নতির শিখরে স্থান করে নেবে, এতে কোনো সন্দেহ নেই।

রোববার হবিগঞ্জ ও সিলেটে সড়ক অবরোধ করে আন্দোলন জোরদার করে সাধারণ চা শ্রমিকরা। ‘৩০০ টাকা মজুরী দে, নইলে বুকে গুলি দে’ এমন স্লোগান শুরু করলে বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার তৎপরতা বেড়ে যায় বলে বিভিন্ন সুত্রে জানা যায়।শোষিত বঞ্চিত মেহনতি চা-শ্রমিকদের আন্দোলনের সাফল্য কামনা করি।

লেখক: আরিফা আক্তার
সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, চতুর্থ বর্ষ
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় : প্রজন্মে প্রজন্মের যাত্রা
                                  

মেহেরাবুল ইসলাম সৌদিপ
“মামা, দুই মিনিট দাঁড়ান” - এ যেনো নিত্যদিনের নিয়মিত কথা। বলছিলাম প্রতিদিন সকালে ছাত্রছাত্রীদের সাথে বিশ্ববিদ্যালয়ের বাসের চালকদের এমন রোজকারের কথোপকথন। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় অনাবাসিক হওয়ায় শিক্ষার্থীদের সাথে ক্যাম্পাসের প্রথম স্মৃতি হয়ে ওঠে বিশ্ববিদ্যালয়ের লাল বাস। আর সেটি যদি হয় ভালোবাসার `প্রজন্ম` তবে তো কোনো কথাই নেই।

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার শুরু থেকে প্রায় ১৭ বছর ধরে ক্যাম্পাস থেকে খিলগাঁও রুটে চলছে দ্বিতল লাল বাস `প্রজন্ম`। ক্লাস-পরীক্ষা কিংবা প্রেজেন্টেশন যাই হোক না কেনো এক ঝাঁক তরুণ শিক্ষার্থীদের নিয়ে প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে ক্যাম্পাসে পৌঁছে দেয় ভালোবাসার এই লাল বাস `প্রজন্ম`। প্রতিদিন সকালে শিক্ষার্থীরা বৌদ্ধ মন্দির, বাসাবো আর খিলগাঁও রেইলগেইটে বাসের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকে। আর ক্যাম্পাসের দ্বিতীয় ফটকে বাস থেকে নেমে অনেকেই আড্ডায় মেতে ওঠেন। বাসে চলে তুমুল আড্ডা। কেউবা সিগেরেট হাতে কেউবা গিটার আবার কেউ কেউ খালি গলায় গানের আসর বসায়। বাসের ভেতর বসে বসে কেউ ঝালমুড়ি খান, চলে জম্পেশ আড্ডা, কেউ-বা বাসে জায়গা রেখে ফুটপাতে নেমে গল্পে মেতে ওঠেন। একই স্টপেজ থেকে বাসে উঠতে উঠতে পরিচিতজন একসময় হয়ে ওঠেন বন্ধুজন। ঝড়বৃষ্টি ভেজা পথই হোক আর তীব্র গরমে সিদ্ধ দিনই হোক, শিক্ষার্থীদের আসা-যাওয়ার নিত্যসঙ্গী প্রিয় এই লাল বাস প্রজন্ম। এটি হাজারো স্বপ্ন বয়ে চলা আবেগের লাল বাহন।

ক্যাম্পাসে আনা-নেওয়ার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ নিজস্ব বাসের পাশাপাশি বিআরটিসির ভাড়া বাসেরও ব্যবস্থা করেছে। প্রতিদিন সকালে এসব বাসে ঠাসাঠাসি-গাদাগাদি করে দাঁড়িয়ে-বসে আর বাদুড়ঝোলা হয়ে ক্যাম্পাসে আসা-যাওয়া করেন শিক্ষার্থীরা। বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় ফটকে প্রতিদিন সকালে এসে পাড়ি জমায় লাল বাসের সাড়ি। তাদের রয়েছে বাহারি সব নাম, আলাদা পরিচয়! উত্তরণ, দুর্জয়, চন্দ্রমুখী, উল্কা, বংশী আরও কত কি! মজার ব্যাপার হলো, কর্তৃপক্ষ নয়, শিক্ষার্থীরাই এসব নামকরণের মাধ্যমে লাল বাসগুলোকে আরো রাঙিয়ে তোলে। নিজেরাই বাসে লাগায় স্টিকার আর সাইনবোর্ড। আকর্ষণীয় করে তুলে পুরো বাসকে আর পরিচয় করিয়ে দেয় পুরো জাতিকে। লাল রঙা এই `প্রজন্ম` বাসের সদস্যরা এক একজনক একটি পরিবারের মধ্যে আবদ্ধ হয়ে ওঠে।

ক্যাম্পাসের শিক্ষার্থীরা নামকরণের মাধ্যমে লাল বাসগুলোকে পরবর্তীতে আরেকপ্রস্থ রঙিন করে তোলে। বাসের ভেতরে গড়ে ওঠে বৈচিত্র্যময় পারিবারিক সম্পর্ক। প্রতিটি বাসেই গড়ে তোলা হয় বিভিন্ন মেয়াদের কমিটি। নিয়মিত যাতায়াতকারী শিক্ষার্থীরা নিজেদের স্বার্থেই গড়ে তুলেছেন বিভিন্ন রুটের বাস কমিটি। ফেসবুকেও সক্রিয় বাস এই কমিটি। কোনো কারণে বাসের সময়সূচি পরিবর্তন করা হলে ফেসবুক গ্রুপ কিংবা পেইজে তা জানিয়ে দেওয়া হয়। বাস কমিটির সদস্য শিক্ষার্থীরা এ দায়িত্ব নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করে আসছেন নিজেদের স্বার্থেই। বাসের সময়সূচিতে পরিবর্তন জানানো থেকে শুরু করে প্রতিটি কমিটির আয়োজনে বার্ষিক বনভোজন, নবীনবরণ, ইফতার পার্টি এমনকি বাসের কোন শিক্ষার্থীর জন্য রক্ত বা অর্থ সাহায্যের প্রয়োজনেও সর্বদা সক্রিয় এই বাসে যাতায়াত করা শিক্ষার্থীরা। এসব কমিটি পরিবারের মতো, যে পরিবার শক্ত বাঁধনে বেঁধে রেখেছে যাত্রীদের সবাইকে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের লাল বাসকে ঘিরে ছাত্রছাত্রীদের জীবনে প্রতিদিনই রচিত হয় আনন্দ-বেদনার কত কাব্য। বাসে সিট রাখা নিয়ে হাতাহাতি-মারামারি প্রাত্যহিক ঘটনা। নিজেদের মধ্যে এই ঝগড়াঝাঁটি মিটমাট করে নেওয়াও সাধারণ ঘটনা। বাসে আসা-যাওয়া করতে করতে শিক্ষার্থী দুই ছাত্রছাত্রীর মধ্যে সখ্য গড়ে ওঠার ঘটনাও বিরল কিছু নয়। শিক্ষাজীবন শেষে যৌথ জীবনের দিকেও পা বাড়ান অনেক জুটি। এক বুক স্বপ্ন, রোমাঞ্চ আর উদ্দীপনা নিয়ে প্রথম বর্ষে বিশ্ববিদ্যালয় আঙিনায় পা রাখে শিক্ষার্থীরা। সময়ের পরিক্রমায় ক্লাসরুম থেকে শুরু করে পুরো ক্যাম্পাস আর লাল বাস হয়ে ওঠে তাদের জীবনের অংশ। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাড়াকৃত লাল বাসগুলোর সংখ্যা দিন দিন কমে আসছে। নিজস্ব কেনা বাসের দিকে ঝুঁকছে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহন পুল।

প্রজন্ম বাসের সিটগুলোর মতই গেইটও উপচে থাকে শিক্ষার্থীদের দ্বারা। তারা গেটে দাঁড়িয়ে কোনদিক থেকে দ্রুত যাওয়া যাবে সেদিকে লক্ষ্য রাখেন, কখনোবা ট্রাফিক পুলিশকে সিগন্যাল ছাড়ানোর অনুরোধ করেন। ঢাকা শহরে বিশ্ববিদ্যালয়ের বাসের ভেতরে শিক্ষার্থীদের সবচেয়ে নিরাপদ লাগে। তাছাড়া জ্যামের একঘেয়েমি কাটাতে সবাই মিলে বাসের গেটে গান ধরেন, হোক সেটা সুরো কিংবা বেসুরো গলায়, তখন আর কারোরই ক্লান্তিবোধটা থাকে না। ভার্সিটি লাইফ শেষে প্রত্যেকেই ব্যাপারগুলো খুব মিস করে। আর এসব দৃশ্য দেখে রাস্তার লোকেরা সবাই অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। এ যেনো এক অন্য রকম মনোমুগ্ধকর পরিবেশের সৃষ্টি করে।

নিয়মিত প্রজন্ম বাসে যাতায়াত করা গণিত বিভাগের ১৪ তম ব্যাচের শিক্ষার্থী মেহেরাজ হোসেন রুম্মান বলেন, ‘আসলে আমাদের প্রজন্ম বাস কেবল একটি বাস নয়, এটা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহ্য। বিশ্ববিদ্যালয় শুরুর প্রথম থেকেই এটি এই রুটে চলছে। গণপরিবহনের অন্যান্য কোনো বাস আমাদের মনে সে অনুভূতি জাগায় না। কারণ প্রজন্ম আমাদের স্বপ্নের বাস, আকাঙ্ক্ষার বস্তু।’

বাসের এক শিক্ষার্থী বলেন, ‘প্রথম এই লাল বাসে যেদিন উঠি, সেদিনের অনুভূতি ছিল অন্যরকম। এই লাল বাসটা বাস্তবে শুধুই একটা বাহন, কিন্তু আমার কাছে আশা আর উৎসাহ হিসেবে কাজ করেছে। লাল বাসে চড়ার স্বপ্ন আমাকে ঘুমোতে দেয়নি।’

এক নারী শিক্ষার্থী বলেন, ‘গণপরিবহনে উঠলে দুর্ঘটনার ভয় সবসময় কাজ করে, আর হ্যারেজমেন্টের ব্যাপারটা আছেই। কিন্তু এই লাল বাসে নিজেকে কেন জানি খুব নিরাপদ মনে হয়।’

নিয়মিত যাতায়াত করার আরেক শিক্ষার্থী বলেন, ‘দু-এক মিনিটের জন্য কতবার যে বাস মিস করেছি, তার কোনো ইয়ত্তা নেই! এই লাল বাসের সাথে রেস প্রতিযোগিতায় আমি কখনো ক্লান্ত হই না।’

বাসের আরে শিক্ষার্থী ফাহিম বলেন, হোক ঠাসাঠাসি, তবু তো নিজেদের, আমাদের, বিশ্ববিদ্যালয়ের লাল বাস, প্রিয় প্রজন্ম। আসন নেই তো কী, বাঁদুড়ঝোলা হতেও আপত্তি নেই।

সারাদিনের ক্লাস শেষে ক্লান্তি নিয়ে ঘরে ফেরার পথে বছরের পর বছর তবু এই `প্রজন্ম` বাসই হয়ে থেকেছে নতুন স্বপ্নের অনুপ্রেরণা। সাধারণের কাছে এই বাস হয়তো কেবলই শিক্ষার্থী বহনকারী লালরঙা বাহন, কিন্তু জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা জানে এই বাস তাদের কতটা আপন, ঘরে ফেরার কত বড় নির্ভরযোগ্য মাধ্যম।

দিন শেষে প্রিয় এই প্রজন্ম বাসটি হয়তো আড়ম্বরপূর্ণ কিছুই নয়, এতে নেই এসি, নেই ভালো আসনও, সবার জন্য নির্ধারিত জায়গাও নেই, অনেক সময় হয়তো দাঁড়িয়ে কিংবা ঝুলে যেতে হয়। তারপরও অনেকে স্বপ্ন বুনতে থাকে এই বাসের কোলে বসে। লাল বাসের জন্য আবেগ সত্যিই বড্ড অদ্ভুত হয়!

২১ আগস্ট ১৫ আগস্টেরই ধারাবাহিকতা
                                  

১৯৪৯ সালের ২৩ জুন জন্মের পর থেকে বহু রক্তাক্ত পথ অতিক্রম করে আজকের আওয়ামী লীগ। সংগঠনটির লাখো নেতাকর্মীর আত্মবলিদানের ফসল আজকের বাংলাদেশ। স্বাধীন বাংলাদেশের অগ্রযাত্রাকে থামিয়ে দিতে একের পর এক যড়যন্ত্র হয়েছে। ষড়যন্ত্রকারীরা এখনও থেমে নেই। বাংলাদেশের স্বাধীনতাবিরোধী দেশীয় ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রকারী সকল গোষ্ঠীকে মোকাবিলা করেই জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ তাঁর অভীষ্ট লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। বঙ্গবন্ধু কন্যার গভীর দেশপ্রেম, দূরদর্শী নেতৃত্ব ও আত্মনিবেদনের ফলেই আমরা এখন মধ্যম আয়ের উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা লাভ করেছি এবং একইসাথে সমগ্র বিশ্বের কাছে উন্নয়নের রোলমডেল হিসেবে প্রতিভাত হতে সক্ষম হয়েছি। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে যে স্বাধীনতা, সেই স্বাধীনতাকে অর্থবহ করার এবং বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা বিনির্মানে তাঁরই সুযোগ্য কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনার ক্লান্তিহীন লড়াইকে থামিয়ে দেবার চেষ্টা হয়েছে বহুবার। ১৯ বার তাঁকে হত্যাচেষ্টা হয়েছে। কিন্তু প্রতিবারই আল্লাহর অশেষ মেহেরবাণীতে তিনি অবিশ্বাস্যভাবে মৃত্যুদুয়ার থেকে ফিরে এসেছেন এবং দ্বিগুণ শক্তি নিয়ে মৃত্যুভয়কে তুচ্ছ করে এই বাংলার মানুষের কল্যাণে নিজেকে সমর্পন করেছেন।

৭৫-এর ১৫ আগস্টে বঙ্গবন্ধুর পরিবারের সকল সদস্যকে নির্মমভাবে হত্যা করলেও বিদেশে অবস্থানের কারণে সৌভাগ্যক্রমে বেঁচে গিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা। হত্যাকারীরা বঙ্গবন্ধুর রক্তের কোনো উত্তরাধিকার রাখতে চায়নি। যেকারণে তাঁর নিষ্পাপ শিশুপুত্র শেখ রাসেলকেও তারা রেহাই দেয়নি।

২১ আগস্ট ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টেরই ধারাবাহিকতা। ২০০৪ সালের এ দিনটি বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি ভয়াবহ কলঙ্কময় দিন। দেশে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তিকে নেতৃত্বশূন্য করার  জঘন্য অপচেষ্টার দিন। বাঙালি জাতির জীবনে আরেক মর্মন্তুদ অধ্যায় রচনার দিন। ২০০৪ সালের এই দিনে আজকের প্রধানমন্ত্রী আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনাকে গ্রেনেড ছুড়ে হত্যার চেষ্টা করা হয়। নেতাকর্মীরা মানবঢাল তৈরি করে তাকে বাঁচাতে পাড়লেও মহিলা লীগের তৎকালীন সভাপতি আইভী রহমান, শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত দেহরক্ষীসহ ২৪ জন নেতাকর্মী এই ভয়াবহ, নৃশংস, নিষ্ঠুর-নির্মম গ্রেনেড হামলায় মারা যান। সেদিন বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রাণে বেঁচে গেলেও তার দুই কান ও চোখ চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অপূরণীয় ক্ষতি হয় তার শ্রবণশক্তির। অলৌকিকভাবে মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরে আসেন।

আওয়ামী লীগ সভাপতি জননেত্রী শেখ হাসিনা তখন জাতীয় সংসদের বিরোধী দলীয় নেতা। বিএনপি সরকারের সন্ত্রাস-দুর্নীতিবিরোধী কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদে সেদিন বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউতে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশের আয়োজন করা হয়েছিল। শেখ হাসিনা বিকাল পাঁচটার দিকে সমাবেশস্থলে পৌঁছান। বুলেটপ্রুফ গাড়ি থেকে নেমে নিরাপত্তাকর্মী ও দলীয় নেতাকর্মী পরিবেষ্টিত অবস্থায় তিনি অস্থায়ী মঞ্চে ওঠেন।

সমাবেশে শেখ হাসিনা বক্তব্য শুরু করেন ৫টা ২ মিনিটে। ২০ মিনিটের বক্তব্য শেষে ৫টা ২২ মিনিটে ‘জয় বাংলা’ ‘জয় বঙ্গবন্ধু’ বলে হাতে থাকা একটি কাগজ ভাঁজ করতে করতে মাইক ছেড়ে পিছিয়ে যাচ্ছিলেন। ঠিক সেই সময় একজন সাংবাদিক তাকে ছবির জন্য একটি পোজ দিতে অনুরোধ করেন। তখন শেখ হাসিনা আবারও  ঘুরে দাঁড়ান। আর ঠিক সেই মুহূর্তেই দক্ষিণ দিক থেকে তাকে লক্ষ্য করে একটি গ্রেনেড ছুড়ে মারা হয়। গ্রেনেডটি ট্রাকের বাঁ পাশে পড়ে বিস্ফোরিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই শেখ হাসিনা ট্রাকের ওপর বসে পড়েন। তার সঙ্গে থাকা অন্য নেতারা এ সময় মানবঢাল তৈরি করে তাকে ঘিরে ফেলেন। প্রথম গ্রেনেড হামলার মাত্র কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই ট্রাক লক্ষ্য করে একই দিক থেকে পর পর আরও দুটি গ্রেনেড নিক্ষেপ করা হয়। বিকাল ৫টা ২২ মিনিট থেকে এক-দেড় মিনিটের ব্যবধানে ১৩টি বিকট বিস্ফোরণ ঘটে। তখন ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের তৎকালীন সভাপতি প্রয়াত মেয়র মোহাম্মদ হানিফ ও সাধারণ সম্পাদক মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া, আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতা আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, নিরাপত্তা কর্মকর্তা মেজর (অব.) শোয়েব, ব্যক্তিগত স্টাফ নজীব আহমেদসহ দেহরক্ষীরা শেখ হাসিনাকে ধরে ট্রাক থেকে দ্রুত নামিয়ে তাঁর গাড়িতে তুলে দেন।

সিনিয়র ফটোসাংবাদিক এস এম গোর্কি সেদিন শেখ হাসিনার ভালো ছবি পাননি বলে তাকে আবারও পোজ দেওয়ার অনুরোধ করেছিলেন। তার অনুরোধে সাড়া দিয়েই বঙ্গবন্ধুকন্যা ফের ডায়াসে ঘুরে দাঁড়ান। এ বিষয়টি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার একাধিক বক্তব্যে নিজেই উল্লেখ করেছেন। একটি অনানুষ্ঠানিক বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছিলেন, ‘নেতাকর্মীরা মানবঢাল তৈরি করে আমাকে বাঁচিয়েছেন। কিন্তু গ্রেনেড গায়ে লাগলে কী হতো বলা যায় না।’ তিনি ফটোসাংবাদিক এস এম গোর্কির নাম উল্লেখ করে বলেন, ‘গোর্কি মনে হয় ভালো ছবি পায় নাই। আমি বক্তব্য শেষ করে যাওয়ার জন্য ঘুরে এক পা বাড়িয়েছি। তখন গোর্কি আমাকে বলে, ‘আপা, ছবি পাই নাই, একটু দাঁড়ান।’ আমি আবারও ঘুরে দাঁড়াই। আর সঙ্গে সঙ্গে বিকট শব্দ। গ্রেনেড যে জায়গায় পড়েছে সেদিক দিয়েই আমার নামার কথা ছিল। কিন্তু ছবি তোলার সুযোগ দিতে ঘুরে দাঁড়ানোয় আমি আবারও ডায়াসে দাঁড়াই।’

প্রথম দফায় হামলার পর স্টেডিয়ামের দিক হয়ে ঘটনাস্থল থেকে দ্রুত শেখ হাসিনাকে সরিয়ে নেওয়া হয়। দলীয় সভাপতি জননেত্রী শেখ হাসিনা যখন ঘটনাস্থল ত্যাগ করছিলেন, তখনও একই দিক থেকে কয়েক সেকেন্ড বিরতি দিয়ে গ্রেনেড এসে ঘটনাস্থলে বিস্ফোরিত হতে থাকে। একইসঙ্গে চলছিল তার গাড়ি লক্ষ্য করে বৃষ্টির মতো গুলিবর্ষণ। এসব গুলি ও গ্রেনেড ঠিক কোথা থেকে ছোড়া হচ্ছিল, তা বোঝা না গেলেও বেশ পরিকল্পিতভাবে যে হামলা হয়েছে, তা পরে বোঝা যায়। তাঁর (শেখ হাসিনা) বাসভবন ধানমন্ডির সুধা সদনে গেলে তাঁকে বহনকারী মার্সিডিজ বেঞ্জ গাড়িটির সামনে-পেছনে গ্রেনেড ও গুলির আঘাতের  অসংখ্য চিহ্ন দেখা যায়।

ঘটনার পর ওই জায়গাটি যেন হয়ে পড়েছিল ‘কারবালা প্রান্তর’। বিস্ফোরণের শব্দ, আহতদের চিৎকার-আহাজারি, রক্তাক্ত নেতাকর্মীদের ছুটোছুটিতে পুরো এলাকা বিভীষিকাময় হয়ে ওঠে। চারদিকে ছোপ ছোপ রক্ত আর মানুষের ছিন্নভিন্ন দেহ। বিচ্ছিন্নভাবে পড়েছিল পায়ের জুতা, সেগুলো ছিল রক্তে লাল। দলের সভাপতি বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনাকে সরিয়ে নেওয়ার পর ট্রাক থেকে রক্তাক্ত অবস্থায় নামতে থাকেন দলের কেন্দ্রীয় নেতারা। যারা অচেতন হয়ে পড়েছিলেন, তাদের ধরে নামানো হয়। কী ঘটছে কিছুই বুঝতে না পেরে অনেক নেতাকর্মী এ সময় ছুটে দলীয় কার্যালয়ের ভেতরে যান। আহতদের মধ্যেও অনেককে ধরে ভেতরে নেওয়া হয়। অনেককে দেখা যায়, পথে রক্তাক্ত অবস্থায় ছুটোছুটি করতে। গ্রেনেড বিস্ফোরণের ঘটনায় এলাকায় যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ায়, আহতদের হাসপাতালে পাঠাতে বিড়ম্বনায় পড়তে হয় দলীয় নেতাকর্মীদের। এ অবস্থায়ই রিকশা, অ্যাম্বুলেন্স, প্রাইভেটকার, বেবিট্যাক্সি, এমনকি রিকশা ভ্যানে করেও আহতদের প্রথমে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। এ সময় অনেককে রক্তাক্ত অবস্থায় মাটিতে পড়ে থেকে সাহায্যের জন্য আকুতি জানাতে দেখা যায়। দলীয় নেতাকর্মীসহ সাধারণ মানুষ আহতদের সহায়তা ও হাসপাতালে নেওয়ার কাজে এগিয়ে এলেও পুলিশ সাহায্য করেনি।

বিস্ফোরণের প্রাথমিক ধাক্কা কাটিয়ে উঠে আওয়ামী লীগ কর্মীরা সেদিন ক্ষোভে ফেটে পড়েন। বিক্ষুব্ধ কর্মীরা রাস্তায় বিক্ষোভ শুরু করেন। ঘটনার অনেক স্থানে আগুন জ্বলতে দেখা যায়। তখন পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ছুঁড়ে বিক্ষুব্ধ কর্মীদের ছত্রভঙ্গ করতে থাকে। আহতদের হাসপাতালে নিতে পুলিশ সাহায্য তো করেইনি, উল্টো বিক্ষুব্ধ নেতাকর্মীদের নির্বিচারে লাঠিপেটা করে এবং টিয়ার গ্যাস ছোঁড়ে।

চারদিকে যানবাহনে দাউদাউ করে আগুন জ্বলছে। রাস্তায় পড়ে আছে জমাটবাঁধা রক্ত, হতাহতদের শরীর থেকে বের হয়ে যাওয়া নাড়িভুঁড়ি, রক্তাক্ত দলীয় পতাকা-ব্যানার, আর পরিত্যক্ত অসংখ্য জুতা- স্যান্ডেল। দলীয় কার্যালয়ের সামনে পেট্রল পাম্পের গলির মাথায় পড়ে আছে একটি তরতাজা গ্রেনেড, অদূরে আরেকটি। আহতদের দলীয় কার্যালয়ের ভেতর থেকে বের করে ভ্যানে ওঠানো হচ্ছিল। পাশের আরেকটি দোকান থেকে বের করে গাড়িতে ওঠানো হচ্ছিল আহত আরও কয়েকজনকে। উদ্ধারকারীরাও আহতদের শরীর থেকে বের হওয়া রক্তে ভিজে একাকার। ফলে পাশে দাঁড়িয়ে থেকেও ঠিক শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছিল না কে আহত আর কে উদ্ধারকর্মী। আহতদের চিৎকার, উদ্ধারকর্মীদের হৈচৈ, বিক্ষোভকারীদের স্লোগানের শব্দে একাকার হয়ে যাচ্ছিল অ্যাম্বুলেন্স আর পুলিশের গাড়ির সাইরেনের শব্দ।

উদ্ধার অভিযান চলাকালে সন্ধ্যা ৬টা ২৬ মিনিটে প্রচণ্ড শব্দে আরেকটি গ্রেনেড বিস্ফোরিত হয়, পুলিশের উপস্থিতিতেই সিটি ভবনের পাশের গলিতে। সভার মঞ্চ হিসেবে ব্যবহৃত ট্রাকের ওপর, এর পাশে, সমাবেশস্থলে এসব বিস্ফোরণ ঘটে। বিস্ফোরণের পর পর ধোঁয়ার কুণ্ডলী, মানুষের চিৎকার, ছুটোছুটিতে প্রাণবন্ত একটি সমাবেশের চেহারাই পাল্টে যায়। আওয়ামী লীগ কার্যালয় আর রমনা ভবনের সড়কে বিভিন্ন জায়গা ভেসে যেতে থাকে রক্তের স্রোতে। ছেঁড়া স্যান্ডেল, রক্ত, পড়ে থাকা ব্যানার, পতাকার সঙ্গে এখানে-সেখানে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে ছিল নারী-পুরুষের দেহ। কেউ নিথর-স্তব্ধ, কেউবা যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছেন।

সেদিন ১৬ জন মারা যান। পরে আরও কয়েকজন মিলিয়ে ওই হামলার ঘটনায় মোট ২৪ জন নিহত হন। শেখ হাসিনাসহ  দলের কেন্দ্রীয় নেতাদের অনেকেই আহত হন। শ্রদ্ধেয় আইভী রহমানসহ ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলায় নিহত সকলের আত্মার মাগফেরাত কামনা করছি।

গ্রেনেড হামলা থেকে কোনোভাবে বেঁচে গেলেও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা যেন প্রাণ নিয়ে ফিরতে না পারেন, তার সব চেষ্টায়ই করেছিল হামলাকারীরা। তাঁর গাড়ির কাঁচে কমপক্ষে সাতটি বুলেটের আঘাতের দাগ, গ্রেনেড ছুঁড়ে মারার চিহ্ন এবং বুলেটের আঘাতে পাংচার হয়ে যাওয়া গাড়ির দুটি চাকা সে কথাই প্রমাণ করে। এটি ছিল একেবারে ঠান্ডামাথায় হত্যার পরিকল্পনা। তিন স্তরের বুলেট নিরোধক ব্যবস্থাসম্পন্ন মার্সিডিজ বেঞ্জ গাড়িটিই সেদিন শেখ হাসিনার প্রাণ বাঁচিয়েছে । গ্রেনেড আক্রমণ ব্যর্থ হলে নেত্রীকে হত্যার বিকল্প পন্থা হিসেবে বন্দুকধারীদের তৈরি রাখা হয়। আর এই বন্দুকধারীরাই খুব হিসাব কষে নেত্রীর গাড়ির কাঁচে গুলি চালায়। গাড়িতে ওঠানোর সময় নেত্রীকে ঘেরাও করে রাখা আওয়ামী সভাপতির ব্যক্তিগত নিরাপত্তারক্ষী মাহবুব স্পটেই মারা যান। গুলি বুলেটপ্রুফ কাঁচ ভেদ করতে ব্যর্থ হলে তারা গাড়ি লক্ষ্য করে গ্রেনেড ছ্ুঁড়ে মারে। কিন্তু এই চেষ্টাও ব্যর্থ হয়। সব শেষে গাড়ির চাকা লক্ষ্য করে গুলি চালিয়ে থামানোর চেষ্টা করা হয়। এ অবস্থায় গুলির আঘাতে গাড়ির বাঁ পাশের সামনের ও পেছনের দুটি চাকা পুরোপুরি পাংচার হয়ে গেলেও চালক অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে সেই গাড়িটি বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউর দলীয় কার্যালয়ের সামনে থেকে ধানমন্ডির সুধা সদনে নিয়ে যান।

সম্পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মদদে ও পৃষ্ঠপোষকতায় সংঘটিত ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলা বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসের ন্যাক্কারজনক ঘটনা। স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রবিরোধী জঙ্গিবাদী মানসিকতার এবং হত্যার রাজনীতিতে বিশ্বাসী যে শক্তিটি তখন রাষ্ট্রক্ষমতায় ছিল তারা জাতির কাছে ক্ষমা পেতে পারে না। গণতন্ত্রে বিশ্বাসী এদেশের সকল মানুষের কাছে এটি এক বিস্ময়কর বেদনার দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।

লেখক : আব্দুর রহমান
সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য
বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ।

পারিবারিক ব্যবস্থা ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে: নেপথ্যে কারণ...
                                  

পরিবার হলো একটি রাষ্ট্র বা সমাজের ক্ষুদ্রতম ইউনিট। যখন একজন প্রাপ্ত বয়স্ক পুরুষ এবং প্রাপ্তবয়স্কা নারী পারস্পরিক সম্মতিতে ধর্মীয় ও রাষ্ট্রিয় আইন মেনে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে সামাজিক স্বীকৃতির মাধ্যমে একই ঘর বসবাস করতে শুরু করে তখন থেকেই একটি পরিবার সৃষ্টি হয়। একেক সমাজে পারিবারিক ব্যাবস্থা একেক রকম। কোন সমাজ পিতৃতান্ত্রিক পরিবার আবার কোন সমাজে মাতৃতান্ত্রিক। বাংলাদের অধিকাংশ পরিবার পিতৃতান্ত্রিক। পরিবারের বাবাই প্রধান কর্তা থাকেন। পরিবারে অন্যান্য সদস্যরা পরবারের সার্বিক কর্মকাণ্ডে সহায়তা করেন। আকারের দিক থেকে পরিবার আবার দুই ধরনের একক পরিবার অন্যটি বৃহৎ পরিবার। বৃহৎ পরিবারে সাধারনত বাবা-মা, ভাই-বোন, দাদা-দাদি, চাচা-চাচি, ফুফু সবাইকে নিয়ে গঠিত। এধরেন পরিবার সাধারনত গ্রামেই আগে দেখা যেতো। একক পরিবার বলতে বুঝায় যেখানে স্বামী-স্ত্রী ও তাদের সন্তান নিয়েই গঠিত। এরকম পরিবার শহরের বেশি হলেও বিশ্বায়ানের যুগে এখন গ্রামেও বৃদ্ধি পেয়েছে। বৃহৎ পরিবার গুলো নানান কারনে ভেঙে ছোট পরিবারে রূপান্তরিত হচ্ছে। আগের বৃহৎ পরিবারের সদস্যদের মধ্যে খুব ভালো সম্পর্ক ছিলো। একে অপরের প্রতি খুবই আন্তরিক ছিলো। সুখে দুঃখে পাশে দাঁড়াতো, নিজেদের মধ্যে ভাগাভাগি করে নিতো। এগুলো এখন শুধুই স্মৃতি।

এখন বিয়ে করে স্বামী স্ত্রী শহরে বসবাস করছেন। স্বামী উপার্জন করছেন আবার কখনো দেখা যায় স্ত্রীও উপার্জন করছেন। সন্তান লালন পালন করছেন। বাবা কর্মব্যস্ত থাকায় খুব ভোরে অফিসে চলে যান। সন্তানরা তাতের বাবার সংস্পর্শ পাচ্ছে না। দাদা-দাদি না থাকায় সন্তানরা তাদেরও সংস্পর্শ পায় না। কর্মক্ষেত্রে ব্যস্ততা থাকার দরুন পরিবারকে সময় দিতে পারছেন না বলে অনেক স্ত্রী স্বামীর প্রতি অভিযোগ করেন। দু’জনেই চাকরির সুবাধে ব্যস্ত সময় পার করার কারনে তাদের মাঝে যে পারষ্পরিক সম্পর্ক থাকার কথা সেটাও ঠিকমত রক্ষা করা সম্ভব হচ্ছে না। ছুটির দিনগুলোতে কোথাও বেড়াতে যেতে পারছেন না। ফলে নিজেদের মধ্যে তৈরি হচ্ছে সন্দেহ, অবিশ্বাস ও কলহ-বিবাদ ইত্যাদি। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অতিমাত্রায় ব্যবহারের ফলে খুব সহজেই অপরিচিত মানুষের সাথে পরিচিত হওয়া। অনেকই অফিসের কলিগ ও ফেইসবুক মেসেঞ্জারের মাধ্যমে পরকীয়ার মত অনৈতিক সম্পর্কে জড়িয়ে যাচ্ছে। ফলে এটাকে কেন্দ্র করে কলহ বিবাহ সৃষ্টি হচ্ছে। ফলস্বরূপ বিবাহ বিচ্ছেদ, হত্যা এবং আত্নহত্যার মত ভয়াবহ ঘটনা গুলো আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে যাচ্ছে।

পারিবারিক কলহ সৃষ্টির পিছনে অর্থনৈতিক ও সামাজিক কারণ থাকলেও বর্তমানে পরকীয়া বা বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কগুলো বেশি। বিবাহের পরও পূর্ববর্তী প্রেমিক বা প্রেমিকার সাথে সম্পর্ক বজায় রাখা বা অফিসের কলিগদের সাথে বা যে কারো সাথে স্বামীর অজান্তে স্ত্রী আবার স্ত্রীর অজান্তে স্বামী পরকীয়ায় জড়িয়ে যাচ্ছে। এতে করে পারিবারিক ভাঙন শুরু হয়। প্রথম আলোর এক জরিপে দেখা গেছে, ঢাকায় দৈনিক ৩৯টি এবং প্রতি ৩৭মিনিটে একটি তালাক বা বিবাহ বিচ্ছেদের ঘটনা ঘটছে। সাহিত্যে, নাটক-সিনেমায়, টিভি সিরিয়ালে পরকীয়া প্রেমকে আকর্ষণীয় ঢং এ উপস্থাপন করা হচ্ছে। সেই বিষয়গুলো বর্তমান সমাজে সরাসরি প্রভাবে ফেলছে। এক্ষেত্রে ভারতীয় নাটক-সিরিয়ালগুলো অগ্রণী ভূমিকা রাখছে। নাটকে দেখানো হয় কিভাবে পরিবারের সদস্য একে একে অপরের প্রতি হিংসা-বিদ্বেষ, ষড়যন্ত্র-কুটচাল করতে হয়। এগুলো দেখতে দেখতে দর্শকরা একমসয় নিজেদের জীবনের প্রয়োগ করতে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। এই ভারতীয় সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের প্রভাবের আজ বাংলাদেশ সরাসরি প্রভাবিত।

সম্প্রতি কতগুলো আলোচিত ঘটনার দেখলেই বুঝা যায়, পরিবারগুলোতে কিভাবে নানারকম সমস্যা তৈরি হচ্ছে।

১. কলেজশিক্ষিকা ও কলেজছাত্রের বিয়ে ঘটনা সম্প্রতি আলোচিত ও সমালোচিত ঘটনা। পারিবারিক কলহের জেরে পূর্বের স্বামীর সাথে বিচ্ছেদ। পরে ফেইসবুকে পরিচিত হয় কলেজছাত্রের সাথে দীর্ঘদিন প্রেম করার পর গোপনে বিয়ে করেন। বিষয়টি প্রকাশ পেলে নানাদিক থেকে বিভিন্ন কটুক্তি শুনতে হয়। কিন্তু বিয়ের ৬ মাস যেতো না যেতোই সেই মহিলার লাশ উদ্ধার করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। হত্যা নাকি আত্মহত্যা সেটা তদন্তের বিষয়।

২.  দুই সন্তানের জননী স্বামীর সাথে মনোমালিন্যের জেরে বাবার বাড়িতে অবস্থানকালীন সময়ে নিজেকে অবিবাহিত দাবি করে ফেইসবুকে পরিচিত হন রংপুরের পীরগাছা উপজেলা সোহেল রানার সঙ্গে প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন। পরে পূর্ব স্বামীকে তালাক দিয়ে সোহেল রানাকে বিয়ে করেন। (আরটিভি নিউজ ২৪শে জুলাই ২০২২ ইং)

৩. প্রেম থেকে বিয়ে, অতঃপর পরকীয়ার সম্পর্কের কথা জেনে যাওয়ায় স্ত্রীকে হত্যা করেছেন মুহাম্মদ সোহাগ (২৭) নামের এক যুবক। (প্রথম আলো ৩রা ফেব্রুয়ারি ২০২২ ইং)

৪. পরকীয়ার সম্পর্কের জের ধরে কথিত পরকীয়া প্রেমিকের সহায়তায় শ্বাসরোধ করে হত্যা করেন নিজের মেয়ে তন্নী আক্তারকে (১৭)।  পুলিশের তদন্তে এমনটাই বেরিয়ে এসেছে। এই ঘটনাটি ঘটেছে বরিশাল সদর উপজেলায়। (প্রথম আলো  ৪ই জুন ২০২২ ইং) ৫. সম্প্রতি খুলনায় এডিসি লাবনী আক্তার আত্মহত্যার কয়েক ঘন্টার মধ্যেই মাথায় অত্র ঠেকিয়ে আত্মহত্যা করেন তার সাবেক দেহরক্ষী মাহমুদুল হাসান। জানা গেছে কন্সারে আক্রান্ত স্বামীর সাথে পারিবারিক কলহ চলছিলো। তখন তার দেহরক্ষী সাথে প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়ে যান। বদলির ঘটনাকে কেন্দ্র করে তাদের মধ্যে মনোমালিন্য চলছিলো। এমনটাই তদন্তে উঠে এসেছে। (২১শে জুলাই ২০২২ ইং)

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পরিচয়, পরে প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়ে বিয়ে পর্যন্ত গড়ায়।  আবার সেই বিয়ে ভেঙে যায় পারস্পরিক সন্দেহ অবিশ্বাস আর দ্বন্দ্ব-কলহের জের ধলে। এই ঘঠনা গুলো সাম্প্রতিক সময়ে বেশি  ঘটছে। পত্রিকার কাগজ খুললেই হত্যা, আত্মহত্যার মত ঘটনা গুলো চোখে পড়ে। এইকিছুদিন আগেও এই ঘটনা গুলো এত বেশি ঘটতে দেখা যায় নি। হাল আমলে কেন বেশি ঘটছে তার কারন কি সেটা অনুসন্ধানের বিষয়। আমাদের দাদা-দাদি, বা বাবা-মায়েদের যুগে এর বিয়ে বিচ্ছেদ ও পারিবারিক কলহ এত বেশি ছিলো না। কদিন আগেও পারিবারিক কলহের একটা ধরন ছিলো যৌতুকের কারনে নারী নির্যাতন, বা অন্যান্য অর্থনৈতিক ও সামাজিক কারনগুলো। কিন্তু বর্তমানে বিশ্বায়নের যুগে সেই সমস্যা গুলো আরো এক ধাপ এগিয়ে নানা রুপ ধারণ করেছে। যে পারিবারিক ও সামাজিক সমস্যাগুলো এখন প্রকট আকার ধারণ করছে সেগুলো হলো—

১. বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে পারষ্পরিক সম্মতিতে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন পরে তা অস্বীকার।

২. বিয়ের দাবিতে প্রেমিকের বাড়িতে প্রেমিকার অনশন বা আইনি নোটিশ প্রেরণ।

৩. সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পরিচয়, প্রেম, বিয়ে, পারিবারিক কলহ পরিণতিতে তালাক, হত্যা বা আত্মহত্যা।

৪. বিয়ের পরও সাবেক প্রেমিক বা প্রেমিকার সাথে সম্পর্ক রেখে পরকীয়ার জড়ানো, পারিবারিক কলহ প্রেমিকার হাত ধরে পালানো।

৫. বিয়ের আশ্বাসে প্রেমিকের সাথে দেখা করতে এসে ধর্ষণ ও গণধর্ষণের শিকার, পরে ধর্ষিতাকে হত্যা বা ধর্ষিতা নিজেই লোকলজ্জার কারনে আত্মহত্যার পথ বেঁচে নেওযা। ৬. সন্তান রেখেও পরকীয়া করে অন্যত্র বিয়ে।

৭. পরকীয়ার সম্পর্ক জেনে যাওয়ায় খোদ নিজের সন্তানকে নিজেই হত্যা করা।

৮. বিয়ের পর ছোটোখাটো কারনে তালাক দিয়ে উচ্চমূল্যের কাবিনের টাকা আদায় করে নেওয়া।

৯. পারষ্পরিক সম্মতিতে শারিরীক সম্পর্ক করা, সেই ভিডিও ধারন করে পরে ব্লাকেমইল করে একাধির বার ধর্ষণ করা।

১০. প্রেমেরর টানে বিদেশীরা বাংলাদেশ চলে আসা এবং বাংলাদেশে থেকে বিদেশে পাড়ি জমানো।

আমাদের সমাজে কয়েকবছর আগেও প্রেম ভালোবাসার সম্পর্ক গুলো নেতিবাচক চোখে দোখা হতো। যারাই যুক্ত ছিলো তারা অন্তত গোপন রাখতেন। কখন বিয়ে পর্যন্ত গড়াতো আবার কখনো বিয়ে পর্যন্তও গড়াতো না। কিন্তু বর্তমানে প্রেম ভালোবাসার ও বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কে নামে যে অশ্লীলতা ছড়াছড়ি সমাজে শরু হয়েছে তারই সরাসরি প্রভাব হলো এই তালাক, হত্যা আর আত্মহত্যা। ভার্চুয়াল জগতের অল্পরকদিনের পরিচয়েই সম্পর্ক গুলো ঘনিষ্ঠ হয়ে যাচ্ছে। ছবি দেওয়া নেওয়া, ভিডিও কলে কথা বলা, দেখা করতে এসে ধর্ষণ, গণধর্ষণের শিকার হচ্ছে দেশের প্রতিটি জনপদের হাজারো আপনার আমার বোনের ন্যায় কিশোরী যুবতীরা। যাস্ট ফ্রেন্ড, বয়ফ্রেন্ড, গার্লফেন্ড, অবৈধ প্রেম ভালোবাসা, বিয়ে বহির্ভূত সম্পর্ক স্থাপন করার যে কালচার আমাদের দেশে চালু হয়েছে সেই অপসংস্কৃতির করুন পরিণতি আজকের আমাদের সমাজে দেখতে পাচ্ছি। পারিবারিক ও সামাজিক ব্যাবস্থায় আজ ঘুনে ধরেছে। মরিচিকা ধরেছে তার প্রতিটি স্থরে স্থরে। সেই ঘুনে ধরা সমাজটাকে পাল্টাতে হলে ধর্মীয় বিধিনিষেধ যথাযথভাবে পালন ও অপরাধীদের উপর রাষ্ট্রীয় আইন দ্রুত কার্যকর করার ব্যাবস্থা ত্বরান্বিত করতে হবে। আজকে এমন এক সমাজ ব্যবস্থা গড়ে উঠছে সেখানে সবকিছু উদার ভাবে চলছে। বিয়ের বহির্ভুত প্রেমের আর নোংরামিকে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। যুবক-যুবতী, কলেজ ইউনিভার্সিটির ছাত্রছাত্রীদের মাঝে অবাধ মেলেমেশা বন্ধ করতে উদ্যোগ গ্রহন করা। মিডিয়ায় নারীদের পণ্য হিসেবে ব্যবহার বন্ধ করা। প্রযোজনে নারীদের জন্য আলাদা, নিরাপদ ও উপযুক্ত কর্মক্ষেত্রে সৃষ্টি করা যেতে পারে। প্রতিটি ধর্মের ধর্মেীয় বিধিনিষেধ যথাযথ মেনে চলতে সচেষ্ট হতে হবে।


লেখক: আশিকুর রহমান সাকিব
শিক্ষার্থী
আরবি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

ভয়াবহ একটি দিবস ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট
                                  

জসিমউদ্দিন খান তুহিন
ভয়াবহ একটি দিবস ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট। স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি জাতিরজনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করা হয়। যিনি তাঁর সারাটি জীবন উৎসর্গ করেছিলেন বাঙালির মুক্তির জন্য, বাঙালির স্বাধিকারের জন্য।
ইতিহাসের নিষ্ঠুরতম এই হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে বঙ্গবন্ধুর সহধর্মিণী শেখ ফজিলাতুন নেছা মুজিব, বঙ্গবন্ধুর একমাত্র ভাই শেখ আবু নাসের, পুত্র শেখ কামাল, শেখ জামাল ও শেখ রাসেল, নবপরিণীতা পুত্রবধূ সুলতানা কামাল ও রোজী জামাল, ভাগ্নে শেখ ফজলুল হক মনি ও তাঁর অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী বেগম আরজু মনি, ভগ্নিপতি আব্দুর রব সেরনিয়াবাত ও তাঁর পরিবারের কয়েকজন সদস্য, বঙ্গবন্ধুর প্রধান নিরাপত্তা কর্মকর্তা কর্নেল জামিল উদ্দিন আহমেদসহ অনেককে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। বিদেশে অবস্থান করায় প্রাণে বেঁচে যান বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা।


১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট খুনিরা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যা করেই ক্ষান্ত হয়নি, বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচারপ্রক্রিয়া বন্ধ করতে ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ জারি করে। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট থেকে দীর্ঘ ২১ বছর বাঙালি জাতি বিচারহীনতার কলঙ্ককের বোঝা বহন করতে বাধ্য হয়। ১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে গঠিত সরকার বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীদের বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে নিয়মতান্ত্রিক বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ২০১০ সালে ঘাতকদের ফাঁসির রায় কার্যকর করার মধ্য দিয়ে বাঙালি জাতিকে কলঙ্কমুক্ত করে।

এই হত্যাকাণ্ডের পেছনে ছিল স্বাধীনতাবিরোধীদের এক গভীর ষড়যন্ত্র। ওই কালরাত থেকে হত্যা ও ষড়যন্ত্রের রাজনীতি জাতির ঘাড়ে চেপে আছে। ইতিহাসের চাকা পেছনে ঘোরানোর চেষ্টাও চলে। স্বাধিকার সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধের ফলে বাঙালি জাতি, বাংলাদেশ এবং বঙ্গবন্ধু সমার্থক শব্দে পরিণত হয়েছিল। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্বের শত্রুরা বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মাধ্যমে প্রকারান্তরে এ দেশের স্বাধীনতাকেই হত্যা করতে চেয়েছিল। পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট অসাংবিধানিক পন্থায় ক্ষমতা পরিবর্তনের যে কালো অধ্যায়ের সূচনা হয় তার পরিণতিতে জাতীয় রাজনীতিতে বারবার বিপর্যয়ের সৃষ্টি হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের মানুষ সাম্প্রদায়িকতা ও দ্বিজাতিতত্ত্বের বিভেদ নীতিকে কবর দিয়েছিল। তা পুনঃপ্রতিষ্ঠার প্রয়াস চলে ১৫ আগস্টের পর থেকে।

বিবেক বিক্রেতা খুনিদের সে অপচেষ্টা সফল হয়নি। বঙ্গবন্ধু নেই কিন্তু তাঁর অপরাজেয় আদর্শ টিকে আছে প্রতিটি বাঙালির হৃদয়ে। ইতিমধ্যে বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার এবং খুনিদের ছয়জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত পলাতক খুনিদের বিদেশ থেকে আইনি পথে দেশে এনে শাস্তি দেওয়ার চেষ্টাও চলছে। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মাধ্যমে বাঙালি জাতির হৃদয় থেকে তাঁর আদর্শ কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা চলেছিল।

সদ্যঃস্বাধীন দেশটিতে তখন চারদিকে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল শুধুই ধ্বংসস্তূপ, পাকিস্তান বাহিনীর নৃশংসতার ছাপ। রাষ্ট্রীয় কোষাগার শূন্য। ছিল না দক্ষ প্রশাসন। এরই মধ্যে পাকিস্তান কারাগারের ফাঁসির মঞ্চ থেকে রক্ষা পেয়ে বঙ্গবন্ধু ফিরে এসেছিলেন বাংলাদেশে। শুরু করেছিলেন দেশ গঠনের নতুন সংগ্রাম। মাত্র সাড়ে তিন বছরে পাহাড়সম বাধা অতিক্রম করে দেশকে তিনি নতুন উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন। ঠিক তখনই হায়েনারা রাতের অন্ধকারে এই হত্যাকাণ্ড ঘটায়। দলছুট কিছু সেনা সদস্যকে কাজে লাগালেও পেছনে ছিল অনেক বড় নীলনকশা। ব্রিটিশ সাংবাদিক মাসকারেনহাসসহ অনেকেই তুলে ধরেছেন সেই ষড়যন্ত্রের অনেক অজানা কথা। তুলে ধরেছেন কুর্মিটোলা গলফ ক্লাবে জিয়াউর রহমানের সঙ্গে কবে, কখন ঘাতক রশীদ বৈঠক করেছিলেন সেসব তথ্য। খন্দকার মোশতাক ও একটি প্রভাবশালী দেশের তৎকালীন রাষ্ট্রদূত কিভাবে ষড়যন্ত্রের জাল বিছিয়েছিলেন; অনেক কিছুই স্পষ্ট হয় পরবর্তী ঘটনামালা থেকে।

রাষ্ট্রদূত বানিয়ে ঘাতকদের পুরস্কৃত করা, ইনডেমনিটির ঘোষণা দিয়ে খুনিদের বিচার রোধের অপচেষ্টা, স্বাধীনতাবিরোধী শাহ আজিজকে প্রধানমন্ত্রী করা, একাত্তরের ঘাতক আব্দুল আলীমসহ রাজাকার-আলবদরদের মন্ত্রী করা, গোলাম আযমকে দেশে ফিরিয়ে এনে রাজনীতিতে পুনর্বাসন করা—এমন অনেক ঘটনাই প্রমাণ করে পঁচাত্তরের ষড়যন্ত্রে কারা যুক্ত ছিল।

১৯৯৬ সালে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ আবার ক্ষমতায় এসে ইনডেমনিটি আইন বাতিল করলে প্রচলিত আইনে হত্যাকাণ্ডের বিচার শুরু হয়। বিচারিক প্রক্রিয়ায়ও উঠে আসে ষড়যন্ত্রের নানা দিক। বিচারের রায় অনুযায়ী কয়েকজন খুনির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে। কিছু খুনি বিদেশে পালিয়ে আছে। তাদের ফিরিয়ে এনে রায় কার্যকর করার মাধ্যমে জাতিকে সম্পূর্ণরূপে কলঙ্কমুক্ত করতে হবে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাঙালির স্বাধীনতা ও মুক্তির প্রতীক। তিনি বাংলার মাটি ও মানুষের পরম আত্মীয়, শত বছরের ঘোর নিশীথিনীর তিমির বিদারী অরুণ, ইতিহাসের বিস্ময়কর নেতৃত্বের কালজয়ী স্রষ্টা, বাংলার ইতিহাসের মহানায়ক, স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্নদ্রষ্টা, স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা। বাঙালি জাতির পিতা।

বাঙালির মহান নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানে চেতনা অবিনশ্বর। বাঙালি জাতির অস্থিমজ্জায় মিশে আছেন বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। মুজিবাদর্শে শাণিত বাংলার আকাশ-বাতাস জল-সমতল। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মের কাছে শেখ মুজিবুর রহমানের অবিনাশী চেতনা ও আদর্শ চির প্রবহমান থাকবে।

জাতির পিতা চেয়েছিলেন ক্ষুধা ও দারিদ্রমুক্ত বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে। বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের জনগণের মুক্তির যে স্বপ্ন দেখেছিলেন তার সুযোগ্য কন্যা শেখ হাসিনার বলিষ্ঠ নেতৃত্বে ক্ষুধা ও দারিদ্র্যকে জয় করে বিশ্বসভায় একটি মর্যাদাবান ও উন্নয়নশীল রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বাংলাদেশ। সারাবিশ্বে বাংলাদেশ আজ উন্নয়নের রোল মডেল।

স্বাধীনতার অর্জনকে নস্যাৎ করার ষড়যন্ত্র এখনো অব্যাহত আছে। তাই ষড়যন্ত্রকারীদের মুখোশ খোলা জরুরি। একইভাবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার ঘটনায় ‘জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রকারী এবং মদদদাতাদের’ চিহ্নিত করে বিচারের জন্য উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন একটি ‘কমিশন’ গঠন করার দাবিও এখন প্রাসঙ্গিক। আমি চাই, দ্রুত সেই কমিশন গঠনের মাধ্যমে আইনসিদ্ধভাবে জাতির সামনে ষড়যন্ত্রকারীদের মুখোশ উন্মোচন করা হোক।

লেখক: সাংবাদিক সাহিত্যিক

১২ আগস্ট আন্তর্জাতিক যুব দিবস : বাংলাদেশ উন্নত বিনির্মাণের প্রকৃত কারিগর যুবকেরা
                                  

ডা.মুহাম্মাদ মাহতাব হোসাইন মাজেদ

শুক্রবার ১২ আগস্ট আন্তর্জাতিক যুব দিবস ২০২২।বিশ্বব্যাপী তরুণ ও যুবদের সমৃদ্ধ নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলা আন্তর্জাতিক যুব দিবসের উদ্দেশ্য। ১৯৯৯ সালে জাতিসংঘ এ দিবসটি পালনের সিদ্ধান্ত নেয়। ২০০০ সালের ১২ আগস্ট থেকে এটি পালন করা হচ্ছে। এ দিবসের মধ্য দিয়ে বিভিন্নভাবে তরুণ ও যুবসমাজকে সচেতন করা হয়।

বিশ্বের সব দেশের সরকারের মধ্যে তাদের দেশের যুবকদের প্রতি মনোযোগ দেওয়া এবং তাদের প্রয়োজনীয়তা পূরণের জন্য সচেতনতা তৈরি করা এই দিবসের লক্ষ্য।

বাংলাদেশের জন্য দিবসটি বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ বর্তমানে বাংলাদেশের প্রায় অর্ধেক জনগোষ্ঠিই তরুণ ও যুবক। তারাই উন্নত বাংলাদেশ বিনির্মাণের প্রকৃত কারিগর।এই যুব সমাজ বিশ্বজুড়ে জলবায়ু পরিবর্তন, মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং এমনকী বর্তমান মহামারী মতো বিভিন্ন ঘটনায় পরিবর্তনের গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হিসাবে কাজ করেছে। বিশ্বব্যাপী সামগ্রীক পরিবর্তন আনতে যুব সমাজের এই অবদানের জন্য প্রতি বছর ১২ আগস্ট আন্তর্জাতিক যুব দিবস পালিত হয়।আর প্রতি বছর জাতিসংঘ আন্তর্জাতিক যুব দিবসের জন্য একটি থিম নির্বাচন করে। তারপরেও, এই থিমের ভিত্তিতে, বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে নানান অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এ সম্পর্কে যুবকদের মতামতও জানা যায়। তাদেরও পরামর্শ নেওয়া হয়। জাতিসংঘ তরুণদের গুরুত্ব উপলব্ধি করেই যুব উন্নয়নের বিষয়ে এখন অধিকতর মনোযোগী। ইন্টারনেট থেকে প্রাপ্ত তথ্যানুসারে জাতিসংঘের হিসাবে, পৃথিবীতে ১০-২৪ বছর বয়সী ২০০ কোটি মানুষ রয়েছে যারা তরুণ এবং মোট জনসংখ্যার চারভাগের এক ভাগ। বাংলাদেশের জাতীয় যুবনীতি অনুসারে ১৮ থেকে ৩৫ বছর বয়সীদের ‘যুব’বলে চিহ্নিত করা হয়েছে। এ হিসেবে মোট জনসংখ্যার এক তৃতীয়াংশই যুব জনতা।জাতিসংঘ বিশ্বব্যাপী পরিবর্তন আনতে যুবকদের জড়িত থাকার বিষয়ে আলোকপাত করার জন্য এই দিন একটি সোশ্যাল মিডিয়া প্রচারও শুরু করেছে।আজকের বিষয় নিয়ে কলাম লিখেছেন জাতীয় রোগী কল্যাণ সোসাইটির প্রতিষ্ঠাতা বিশিষ্ট গবেষক ডা.এম এম মাজেদ তার কলামে লিখেন...দেশের যুব সমাজকে দক্ষ করে গড়ে তুলতে সরকারি ও নানা উদ্যোগের কোন বিকল্প নেই। দেশের রাজনীতি, অর্থনীতি ও সমাজকে আলোকিত করতে এই যুব সমাজের ভূমিকা অবিস্মরণীয়। সামগ্রিক প্রেক্ষাপটে যুব সমাজের অংশগ্রহণ কখনো কখনো আমাদেরকে উদ্বিগ্ন করে, কারণ আমরা সমাজের কল্যাণকর কাজের পাশাপাশি আমরা দেখতে পাই যুবসমাজ নানা ধরণের ঘৃণ্য অপকর্মের সাথে যুক্ত হয়ে যাচ্ছে। শুধু তাই নয় যুবসমাজ নেশায় আসক্ত হয়ে পরিবার সমাজ এবং রাষ্ট্রের জন্য বোঝা হয়ে তৈরি হচ্ছে। এটি আমাদের জন্য কখনোই কাম্য নয়, কাম্য ছিলও না।আর বৈশ্বিক বিভিন্ন সংকটের কারণে বিশ্বের অনেক জনগোষ্ঠীই বর্তমানে বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ ও খাদ্য নিরাপত্তার সম্মুখীন হচ্ছে, বর্তমান সময়ের প্রেক্ষাপটে সারা পৃথিবীব্যাপি উল্লেখযোগ্য চ্যালেঞ্জ হলো কোভিড-১৯ এর প্রার্দুভাব এবং জলবায়ু পরিবর্তন। এখনও সকল ক্ষেত্রে ও বিভিন্ন উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় যুবদের সম্পৃক্ততা ও ক্ষমতায়নের অভাব রয়েছে। এই বিশাল সংখ্যক যুবদের অর্থবহ অংশগ্রহণ নিশ্চিত না করতে পারলে তারা দেশের উন্নয়ন তথা গণতান্ত্রিক রাজনীতির উৎকর্ষ সাধনে ভূমিকা রাখতে পারবে না, তাই যুবদের সহযোগিতা নিয়ে দেশ তথা বিশ্ব এগিয়ে যাবে, রাষ্ট্রায়ত্ব, স্বায়ত্বশাসিত, বেসরকারি সকল প্রতিষ্ঠানেই যুবদের কাজ করার সুযোগ করতে তৈরি করতে হবে, যেন তারা তাদের মেধা ও দক্ষতা বিকাশের সহায়ক পরিবেশ পায়। কোভিড-১৯ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জের মতো সংকট কার্যকরভাবে মোকাবেলা করার লক্ষ্যে যুবদের অর্থবহ অংশগ্রহণ অতীব জরুরী। যুবদের সক্ষমতার প্রয়োগ ও সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে ও তাদের কর্মোদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে তাদের প্রতিনিধিত্বকে নিশ্চিত করতে হবে।

এদেশের মুক্তি সংগ্রাম থেকে শুরু করে সকল গণতান্ত্রিক আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছে এ দেশের যুবসমাজ। শুধু তাই নয় দেশের রাজনীতি, অর্থনীতি ও সমাজকে আলোকিত করতে এই যুব সমাজের ভূমিকা অবিস্মরণীয়। যুবসমাজ এদেশের ক্রান্তিকালে সব সময় নিজেদের জীবনকে উৎসর্গ করার মধ্য দিয়ে নিজেরা যেমন হয়েছেন ইতিহাসের উজ্জ্বল স্বাক্ষী, তেমনিভাবে তাদের এই আত্মত্যাগ পরবর্তী প্রজন্মের জন্য হয়ে আছে চির অনুসরণীয়। গণতান্ত্রিক সকল আন্দোলন অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে এ দেশের যুবসমাজ সবসময় ছিলো সক্রিয় এবং অনাচারের বিরুদ্ধে তাদের কণ্ঠকে সব সময় উচ্চকিত করেছে, তারই মধ্য দিয়েই এসেছে ইতিবাচক পরিবর্তন। কখনো বদলে গেছে ঘুনে ধরা পুরো প্রেক্ষাপট। তবে আজ সামগ্রিক প্রেক্ষাপটে যুব সমাজের অংশগ্রহণ কখনো কখনো আমাদেরকে উদ্বিগ্ন করে, কারণ আমরা সমাজের কল্যাণকর কাজের পাশাপাশি আমরা দেখতে পাই যুবসমাজ নানা ধরণের ঘৃণ্য অপকর্মের সাথে যুক্ত হয়ে যাচ্ছে। শুধু তাই নয় যুবসমাজ নেশায় আসক্ত হয়ে পরিবার সমাজ এবং রাষ্ট্রের জন্য বোঝা হয়ে তৈরি হচ্ছে। এটি আমাদের জন্য কখনোই কাম্য নয়, কাম্য ছিলও না। কারণ আমাদের অতীত ইতিহাস কখনোই আমাদেরকে এই শিক্ষা দেয় না। এ দেশের যুবসমাজ প্রগতিশীল ভাবনা আর মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধারণ করে যে অতীত স্বর্ণালী ইতিহাস তৈরি করেছে তা আজও ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা আছে। তবে বর্তমানে কেন, যুব সমাজের মধ্যে কুলুষিত রাজনৈতিক দীক্ষা আর রাজনৈতিক ক্ষমতাকে অপব্যবহারের মাধ্যমে বিত্ত-বৈভব কুক্ষিগত করার নগ্ন মানসিকতা তাদের মগজে ঠাঁই পেয়েছে?

আমি বরাবরই একজন আশাবাদী মানুষ। আমি এখনো দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, এ দেশের যুবসমাজ এখনো পুরোপুরি নষ্ট হয়ে যায় নি, তবে কিছু যুবক বা যুবতী রয়েছে যারা কিছুটা পথভ্রষ্ট, যে মূল্যবোধের ইতিবাচক শিক্ষায় তাদের মেধা ও মনন বিকশিত হওয়ার কথা ছিল, সেটি পরিপূর্ণভাবে বিকশিত হয়নি, ফলে তারা আত্মকেন্দ্রিক মনোভাব কে অগ্রাধিকার দিয়ে জীবনকে পরিচালিত করছে। যেটা সামগ্রিকভাবে একটি হতাশার জন্ম দিচ্ছে। তবুও আমি বিশ্বাস করি, এ প্রজন্মের মাঝেও অনেক সৃজনশীল প্রতিভাবান যুবক ও যুবতী রয়েছে। যাদের কর্মতৎপরতায় শুধু তারা নিজেরাই বিকশিত হচ্ছে না বরং তাদের ব্যক্তিক সাফল্যের দ্বারা তারা পুরো দেশকে প্রতিনিধিত্ব করছে। দেশের অর্জন এবং সুনামকে তারা বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দিচ্ছে। এই ইতিবাচক দিকগুলো আমাদের যুব সমাজের মাঝে বেশি করে ছড়িয়ে দিতে হবে। তাদেরকে ছাত্রাবস্থায় জীবন গঠনে ইতিবাচক দিকগুলো সম্পর্কে জানানোর সঠিক উদ্যোগ নিতে হবে। কারণ একটা পর্যায় থাকে, যখন মানুষের মস্তিষ্ককে যেভাবে পরিচালিত করা হয়, মস্তিষ্ক ঠিক সেভাবেই তার প্রতিফলন ঘটায়। সুতরাং আমাদেরকে চলমান সঙ্কট দূর করার ক্ষেত্রে আশাবাদী হতে হবে, ঐক্যবদ্ধ হতে হবে এবং আমাদের দেশের সম্ভাবনাময় যুবসমাজকে কেউ যেন ভুল পথে ধাবিত করতে না পারে, সেজন্য সবাইকে সজাগ থাকতে হবে। কারণ আজকের এই যুবসমাজই আগামী দিনে এদেশের কর্ণধার হবেন। রাষ্ট্র পরিচালনা করবেন। সুতরাং এখন থেকে তাদের মাঝে যদি মূল্যবোধের ইতিবাচক চর্চা এবং জীবন সম্পর্কে সঠিক ধারণা তৈরি করা যায়, তাহলে এটি যেমন ঐ যুবকদের ব্যক্তিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে, তেমনি এ দেশের সামগ্রিক উন্নয়নের চাকাকে গতিশীল রাখতে সক্রিয় ভূমিকা রাখবে বলে বিশ্বাস করি। যার ফলে এ দেশের উন্নয়নে ছেলে মেয়ে, নারী পুরুষ নির্বিশেষে সবাই মিলে আগামীর সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার যে স্বপ্ন রয়েছে, সেটাকে বাস্তবে রূপান্তরিত করা সম্ভবপর হবে। সুতরাং পুরুষের পাশাপাশি পরিবারের নারী সদস্যদের কে সমান সুযোগ দিয়ে এবং তার অর্জিত মেধা-দক্ষতাকে যেন দেশের কল্যাণে কাজে লাগাতে পারে, সেই ধরণের সুযোগ বা ক্ষেত্র তৈরি করতে হবে।পরিশেষে বলতে চাই, আমাদের এ উন্নয়নশীল দেশে রয়েছে এক বিরাট যুব সমাজ- এদের হাতকে দেশ গড়ার কাজের উপযোগী করে তুলতে পারলে, মনে দেশপ্রেম এবং কর্মের প্রতি আগ্রহ বাড়িয়ে উদ্বুদ্ধ করতে পারলে নিঃসন্দেহে বলা যায় আমাদের এ দেশ আর গরিব থাকবে না।

উন্নয়নের মাধ্যমে উন্নত হবেই। আজকের এ মহান দিনে আমাদের সকলের শপথ হোক যুব সমাজকে দেশের- দশের জাতির উন্নয়নে সম্পৃক্ত করা। আর এ ধারাবাহিকতা অব্যাহত রাখতে পারলেই জাতীয় যুব দিবস পালনের সার্থকতা বাস্তবে প্রতিফলিত হবে। যুব দিবসের তাৎপর্য ও গুরুত্ব আরো বৃদ্ধি পাবে।

লেখক, প্রতিষ্ঠাতা, জাতীয় রোগী কল্যাণ সোসাইটি

বৃদ্ধাশ্রম নয় বরং প্রয়োজন সন্তানের ভালোবাসার
                                  

সাফা আক্তার নোলক
জীবনের শেষ অধ্যায়ে; বৃদ্ধ বয়সে খারাপের ভালো হিসেবে বেশ পরিচিত বৃদ্ধাশ্রম। বৃদ্ধাশ্রম হলো বৃদ্ধ মানুষের আশ্রয়স্থল; সেসব বৃদ্ধদের যারা তথাকথিত সন্তান হতে চ্যুত হয়ে আজ একা।

মানবতার বিপরীতে বাস্তব জীবনের কলঙ্কময় দিকের দিকে আঙুল তুলে দাড়িয়ে আছে প্রতিটি বৃদ্ধাশ্রম। মানবতা পদদলিত এই বৃদ্ধাশ্রম গুলো মনে করিয়ে দেয় ক্রন্দনরত মায়ের মুখ ও বুক ভরা আশা নিয়ে করুণ দৃষ্টিতে চেয়ে থাকা বাবার চোখের লুকানো অশ্রু। সারাটা জীবন সন্তানের জন্য উজার করে দিলেও, জীবনের শেষ অধ্যায়ে এসে তাদের নিয়ে বেঁচে থাকার বৃথা চেষ্টা। সারা জীবন যে বাবা-মা এর অবদান ছাড়া বেঁচে থাকা দায় ছিল, আজ যেন সন্তানদের বেঁচে থাকার পথে তারা এক বিশাল বোঝার সমান।

বৃদ্ধাশ্রম এর একটি প্রাণ ও ভালো নেই। তাদের মনে গাঁথা একরাশ দুঃখ, যা হয়তো কোনো একদিন আর থাকবে না এ আশা নিয়ে কেউ, আবার কেউ হয়তো সকল আশা ভুলে এক করুণ জীবনের শেষ প্রান্তে দাড়িয়ে আছে। সারা বৃদ্ধাশ্রম জুড়ে আছে জীবনের শেষ প্রান্তে আসা অতৃপ্ত বৃদ্ধদের হাহাকার। সেখানে কেউ চেয়ে আছে নিজ সন্তানের করুণা করা এক দিনের আশায়, আবার কেউ হাফ ছাড়ছে রুদ্ধশ্বাসে বন্দি পরিস্থিতি থেকে আজ কিছুটা স্বস্তিতে এই ভেবে। কিন্তু ভেতরে তাদের আজ ও হাহাকার।

আমাদের সমাজের তথাকথিত শিক্ষিত ব্যক্তিরাও আজ এ কাজে পিছিয়ে নেই। তাদের কাছেও তাদের বাবা-মা আজ তাদের বোঝার সমান। কি অমানবিক আচরণ! শিক্ষা তাদের শিক্ষিত করতে পারেনি। বৃদ্ধাশ্রম এর প্রতিটি বৃদ্ধের কান্না মনে করিয়ে দেয় আমরা মানবিকতার কতটা শেষ পর্যায়ে আছি। তাদেরকে তাদের কথা জিজ্ঞাসা করা হলে তারা তাদের কান্না আর থামাতে পারে না। এ দৃশ্যটি যেন সমাজের এক করুণ ও অঘটনীয় দৃশ্য। আমরা আমাদের বাবা-মা এর করুণ চাহনির সমাধান দিতে পারিনি। তাদের অমলিন হাসি রক্ষা করতে আজ আমরা ব্যর্থ। এ কথা গুলো হয়তো আমাদের অনেকের মনে নাড়া দিলে ও কিছুক্ষণ পর ঘোর কেটে গেলে আমরা আবারো ব্যস্ত তাদের প্রতি এই নির্মমতার পরিচয় দিতে।

বর্তমান চিন্তাধারার প্রেক্ষিতে বাবা-মা এর চিন্তা-ভাবনা কেবল অন্তরায় সৃষ্টি করছে - বর্তমান প্রজন্মের এই অসুস্থ চিন্তাভাবনার ফল হলো বৃদ্ধাশ্রম। এসব অস্বস্তিকর চিন্তা মানুষকে ঠেলে দিচ্ছে এরকম অমানবিক কার্যকলাপে। ছোটবেলা থেকে অসীম ভালোবাসা দিয়ে আমাদের একটু একটু করে বড় করে তুলেছে বাবা-মা। কিন্তু আমরা কি তার পরিচয় দিচ্ছি নাকি এর বিনিময়ে তাদের পাওনা হিসেবে তাদেরকে উপহার দিচ্ছি বৃদ্ধাশ্রম।

এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, ১৯৯০ সালে বিশ্বে প্রবীণদের সংখ্যা ছিল ৫০ কোটি। বর্তমানে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১১০ কোটিতে। ২০৩০ সালে এর সংখ্যা হবে ১৫০ কোটি এবং ২০৫০ সালে প্রবীণদের সংখ্যা ২০০ কোটিকে ও ছাড়িয়ে যাবে। বাংলাদেশে বর্তমান প্রবীণদের সংখ্যা প্রায় ১.৫ কোটি। ২০২৫ সালে প্রবীণদের সংখ্যা দাঁড়াবে প্রায় ২ কোটি। ২০৫০ সালে এই প্রবীণ সংখ্যা হবে প্রায় ৪.৫ কোটি এবং ২০৬১ সালে এ সংখ্যা গিয়ে দাঁড়াবে প্রায় ৬ কোটিতে। জনসংখ্যার প্রায় ৬ শতাংশ প্রবীণ। এই বিশাল জনগোষ্ঠীকে আজ আমরা অচিরেই দূরে ফেলে দিয়েছি। প্রায় ৮৮ ভাগ প্রবীণদের তাদের সন্তানদের সাথে কোনো যোগাযোগ নেই। চোখ ও মুখে তাদের শুধু হতাশা যা কখনোই কাম্য নয়।

পৃথিবীর প্রথম বৃদ্ধাশ্রম প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল প্রাচীন চীনে। শান রাজবংশের উদ্যোগ এ ঘরছাড়া অসহায় বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদের জন্য আশ্রয়কেন্দ্র তৈরি করা হয়েছিল। খ্রিষ্টপূর্ব ২২০০ শতকে পরিবার থেকে বিতারিত বৃদ্ধদের জন্য আলাদা এই আশ্রয়কেন্দ্র তৈরি করে ইতিহাসে আলাদা জায়গাই দখল করে নিয়েছিল এই শান রাজবংশ।

বাংলাদেশে বর্তমানে বৃদ্ধাশ্রম এর সংখ্যা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। কিন্তু এর সাথে মানুষের মানসিকতার কোনো উন্নতি হচ্ছে না। যার ফলে বৃদ্ধাশ্রম কমানোর দরকার হলেও তা হচ্ছে না। বাংলাদেশের একটি সরকারি বৃদ্ধাশ্রম রয়েছে যা, গাজীপুরে অবস্থিত । অন্য দিকে বেসরকারি পর্যায়ে অনেক গুলো বৃদ্ধাশ্রম রয়েছে। সরকারি বয়স্ক পুনর্বাসন কেন্দ্রটি সমাজ সেবা অধিদপ্তর এর অধীনে পরিচালিত হয়, আর বেসরকারি গুলো ব্যক্তিমালিকানা বা বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা কর্তৃক পরিচালিত হয়। বাংলাদেশের বৃদ্ধাশ্রম এর পরিমাণ এতো বৃদ্ধি পাবে তা আগে কখনো চিন্তা করা হয়নি।

প্রতিবছর ১ অক্টোবর বিশ্ব প্রবীণ দিবস পালন করা হয়। যা বৃদ্ধের বিভিন্ন অধিকার জাগরণের উদ্দেশ্যে পালন করা হয়।

বৃদ্ধারা কোনো বোঝা কিংবা ফেলনার জিনিস নয়। বরং তারা সমাজের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাই তাদের প্রতি ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি দেওয়া আমাদের দায়িত্ব। বৃদ্ধাশ্রমে বৃদ্ধারা নিজের মধ্যে ভীষণ একা। প্রতিটি সন্তানের উচিত তার বাবা-মা এর প্রতি তাদের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করা। তাদের সর্বোচ্চ স্বাধীনতা ও শান্তি নিশ্চিত করা। এই অমানবিক আচরণ থেকে আমরা যেদিন মুক্তি পাবো সেদিন সমাজে শান্তি ফিরে আসবে। কোনো বৃদ্ধের চোখে থাকবে না করুণ চাওয়া, মনে থাকবে না অতৃপ্ত আশা। বরং তারাও হাসবে তাদের প্রাণখুলে। আশ্রয়স্থল নিয়ে তাদের মধ্যে থাকবে না আর অধীর চিন্তা ও অনিশ্চয়তা।

দর্শন বিভাগ,
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।

শত বাঁধা পেরিয়েও এগিয়ে যাচ্ছে জবি
                                  

সুমাইয়া আক্তার

পুরান ঢাকার সদরঘাটে অবস্থিত বাংলাদেশের একটি ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়। জগন্নাথ কলেজকে একটি পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে ঘোষণার মাধ্যমে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় যাএা শুরু করে। ১৮৫৮সালে প্রতিষ্ঠিত ব্রাহ্ম স্কুলের পরিবর্তিত রূপই আজকের জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়। ১৮৭২ সালে বালিয়াটির জমিদার কিশোরী লাল রায় তাঁর পিতা জগন্নাথ রায় চৌধুরীর নামে এই বিদ্যাপীঠের নামকরণ করেন। 

১৮৮৪ সালে এটি একটি দ্বিতীয় শ্রেণীর কলেজ ও ১৯০৮ সালে প্রথম শ্রেণীর কলেজে পরিণত হয়।

 

তখন এটিই ছিল ঢাকার উচ্চ শিক্ষার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হলে জগন্নাথ কলেজের স্নাতক ও স্নাতকোত্তর কার্যক্রম বন্ধ করে ইন্টারমিডিয়েট কলেজে অবনমিত করা হয়। তৎকালীন জগন্নাথ কলেজের ডিগ্রির শিক্ষক, শিক্ষার্থী, গ্রন্থাগারের বই পুস্তক ও জার্নাল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে স্থানান্তর করা হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রন্থাগার সাজাতে তৎকালীন জগন্নাথ কলেজ গ্রন্থাগারের ৫০ ভাগ বই দান করা হয়। ১৯৪৮ সালে পুনরায় এই কলেজে স্নাতক কার্যক্রম শুরু হয়। ২০০৫ সালে দীর্ঘদিন ধরে ছাএদের আন্দোলন আর সংগ্রামের ফলস্বরূপ জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় আইন - ২০০৫ পাশ হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের বয়স ষোলো বছর হলেও এই প্রতিষ্ঠানের ঐতিহ্য সুদীর্ঘ দেড়শ বছরের।

শুরু থেকেই বিশ্ববিদ্যালয়টির সকল বিভাগে সেমিস্টার পদ্ধতি চালু রয়েছে। অনেক আগেই ইউজিসির প্রতিবেদনে এ-গ্রেড ভুক্ত পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মর্যাদা লাভ করেছে এই প্রতিষ্ঠানটি।

বিসিএসসহ সকল প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় নিজেদের শক্ত অবস্থান তৈরিতে সক্ষমতা অর্জন করেছেন এই প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা। স্পেনের সিমাগো ইনস্টিটিউশন র‍্যাঙ্কিং-২০২২ এর প্রকাশিত ফলাফলে আন্তর্জাতিক মানদন্ডে রসায়ন বিষয়ে গবেষণা সূচকে বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে প্রথম স্থান অর্জন করে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়। যেখানে শতবর্ষী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান ষষ্ঠ সেখানে মাএ ১৬ বছরেই জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় প্রথম স্থান দখল করে নিয়েছে।

কিন্তু দুঃখের ব্যাপার হলো এই, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়কে এখনো অনাবাসিক বিশ্ববিদ্যালয়ের লজ্জা বহন করতে হয়। ক্লাস-পরীক্ষা বর্জন করে কিছু দিন পরপর হলের দাবিতে শিক্ষার্থীদের রাজপথে নামতে হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের ১১টি হল দখল করে রেখেছে স্থানীয় দখলদাররা। অবকাঠামোগত সমস্যা ও বাজেট বৈষম্যের শিকার বিশ্ববিদ্যালয়টি। পর্যাপ্ত বাজেটের অভাবে শিক্ষকদের খাতা দেখার সম্মানিও আটকে থাকতে দেখা যায়। ২১ হাজার শিক্ষার্থীর জন্য নেই পর্যাপ্ত পরিবহন ও ক্যান্টিন সুবিধা। সব মিলিয়ে এক সময় বাংলার আলীগড় খ্যাত বর্তমান জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা হল না থাকায় অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের চেয়ে বেশি মানবেতর জীবনযাপন করছে।

এই ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটির একসময় ১৪টি হল ছিল আর বর্তমানে সেগুলোর একটাও নেই সব স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিদের দখলে। একটি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের হল কিভাবে অসাধু মানুষ অবৈধভাবে দখল করে নিতে পারে তার উওর মেলানো বড় দায়। বাংলাদেশের প্রত্যেকটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়েরই কম হোক বেশি হোক ছাএ ছাএী উভয়দের জন্য হলের ব্যবস্থা রয়েছে। শুধু জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ই বাংলাদেশের একমাএ অনাবাসিক পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়। রাজধানীতে অবস্থিত মাএ ষোল বছর বয়সী এই বিশ্ববিদ্যালয়টি এত দুরবস্থা ও সংকটের মধ্যে ও পিছিয়ে নেই। শত সীমাবদ্ধতার মধ্যেও এগিয়ে যাচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়টি। একটি আন্তর্জাতিক মানের বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে নিজেদের জানান দিতে নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন জবির শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা।

এ বিশ্ববিদ্যালয়ে বর্তমানে অধ্যয়নরত বেশিরভাগ শিক্ষার্থীই জানেন যে তাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে এতদিন কোনো হল ছিল না সম্প্রতি ২০২০ সালে একটি ছাএী হল "বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব হল" নির্মিত হয়। কিন্তু তারা এটা জানে না যে এই প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের এক সময় ১৪টি হল ছিল যা এখন সব স্থানীয় প্রভাবশালী অসাধু কিছু লোকের দখলে।

ছাএীদের তুলনায় সিট সংখ্যা সীমিত হওয়ায় একটি মাএ ছাএী হলে সব ছাএীদের সিট দেওয়া সম্ভব হয়নি। ফলে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল ছাএ ও অধিক সংখ্যক ছাএীদের আলাদা বাসা ভাড়া দিয়ে থাকতে হচ্ছে পড়াশোনার জন্য। যেহেতু প্রায় ৯০ শতাংশ শিক্ষার্থীই ঢাকার বাইরে থেকে এখানে পড়তে আসে। আর পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া বেশিরভাগ শিক্ষার্থীই মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবার থেকে উঠে আসে। তাদের পড়াশোনা, খাওয়া দাওয়া চলাফেরার খরচসহ অতিরিক্ত বাসা ভাড়ার খরচ দিয়ে থাকতে হচ্ছে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের। অনেকে এ টাকা জোগাড় করতে গিয়ে হিমশিম খান। কারো কারো পরিবার দিতে অক্ষম। কেউ বা আবার দিনরাত পরিশ্রম করে টিউশন ও পার্ট টাইম জব করে পড়াশোনার খরচ জোগাচ্ছেন। এত সংকট আর দূর্দশার মধ্যে দিয়ে কেন যেতে হবে একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের?

বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ আর সরকার জোর দিয়ে বিষয়টি দেখলেই হয়তো হলগুলো উদ্ধার করা সম্ভবপর হতো। শিক্ষার্থীদের অনেক সমস্যার সমাধান হতো যদি আজ হলগুলো অন্যায়ভাবে দখল হয়ে না যেত। শিক্ষা দীক্ষায় আরো এগিয়ে যেতে পারতো বিশ্ববিদ্যালয়টি, প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর অভাবে যা সম্ভব হচ্ছে না। এদিকে দ্রুত কেরানীগঞ্জে ২০০ একরের নতুন ক্যাম্পাস স্থানান্তরের কথা থাকলেও এখনো নতুন ক্যাম্পাসের বাউন্ডারি দেওয়াই শেষ হয়নি। নির্মাণ কাজে এত দীর্ঘসূত্রতা সেটার দিকেও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বা সরকার কারোরই কোনো নজর নেই।

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষার্থী হিসেবে একটি সুন্দর, সাজানো এবং বর্ধিত ক্যাম্পাস আশা করছি। যেখানে শিক্ষার্থীদের আবাসন, খাদ্য, প্রয়োজনীয় ইন্টারনেট, ক্লাসরুম, লাইব্রেরি, ল্যাব কোনো কিছুর কোনো সংকট থাকবে না। ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার অনুকূল পরিবেশ বজায় থাকবে। নিরাপদ বাসস্থান ও স্বাস্থ্যকর খাদ্য ও পানি সরবরাহ নিশ্চিত থাকবে। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিজের অবস্থান উল্লেখযোগ্য স্থানে নিয়ে যাবে জবি সেই প্রত্যাশা ব্যক্ত করছি। শত বাধা পেরিয়ে ও এগিয়ে যাক প্রাণের জবি।

লেখক : সুমাইয়া আক্তার
শিক্ষার্থী : গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

নিরাপদ মাছে ভরবো দেশ, বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ
                                  

কৃষিবিদ মো.সামছুল আলম

হাজার বছর ধরে আবহমান বাংলার সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের সাথে মিশে আছে মাছ শব্দটি। তাই প্রবাদেও আছে “মাছে ভাতে বাঙালি”। এটি শুধু প্রবাদ নয়, বাঙালির জাতীয় চেতনাও বটে। এ চেতনাকে ধারণ করেই মাছ চাষী, মৎস্য বিজ্ঞানী ও গবেষক এবং সম্প্রসারণবিদসহ সংশ্লিষ্ট সকলের নিরলস প্রচেষ্টায় বাংলাদেশ আজ মৎস্য সম্পদে অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জন করেছে।

বৈশ্বিক করোনা মহামারি পরিস্থিতিতে দেশের প্রায় সকল ক্ষেত্রে উৎপাদন ব্যাহত হলেও মৎস্য সেক্টরে এর প্রভাব পড়েনি। এর ফলস্বরূপ দেখা যায়, কোভিড-১৯ এর কারণে বিশ্ববাজারে আর্থিক মন্দাবস্থা থাকা সত্ত্বেও মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের ফলে সর্বশেষ ২০২১-২২ অর্থবছরে ৭৪ হাজার ৪২ দশমিক ৬৭ মেট্রিক টন মৎস্য ও মৎস্যজাত পণ্য রপ্তানির মাধ্যমে ৫ হাজার ১৯১ দশমিক ৭৫ কোটি টাকা আয় হয়েছে, যা গত বছরের চেয়ে শতকরা ২৬ দশমিক ৯৬ ভাগ বেশি।


বাংলাদেশের সামগ্রিক কৃষি সেক্টরে মৎস্যখাত একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র।এক্ষেত্রে ধারাবাহিকভাবে উৎপাদন কার্যক্রম অব্যহত থাকার ফলে মাছ উৎপাদন নিয়মিত বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলশ্রুতিতে বাংলাদেশ আজ বিশ্ব পরিমন্ডলে মাছ উৎপাদনে বিভিন্ন ক্ষেত্রে ঈর্ষণীয় রেকর্ড তৈরি করেছে।এরই ধারাবাহিকতায় দেশ আজ অভ্যন্তরীণ মুক্ত জলাশয়ে মাছ আহরণে বিশ্বে ৩য়, স্বাদুপানির মাছের উৎপাদন বৃদ্ধির হারে ২য়, বদ্ধ জলাশয়ে মাছ উৎপাদনে ৫ম,অ্যাকোয়াকালচার, অর্থাৎ মাছের সঙ্গে অন্যান্য জলজ উদ্ভিদ উৎপাদনে ৫ম, ইলিশ আহরণে বিশ্বে ১ম,সামুদ্রিক ও উপকূলীয় ক্রাস্টাশিয়া এবং ফিনফিস উৎপাদনে যথাক্রমে ৮ম ও ১২তম। তাছাড়া তেলাপিয়া মাছ উৎপাদনে বিশ্বে ৪র্থ এবং এশিয়ায় ৩য় (অ.স ২০২২)।মাছের সম্ভবনাময় উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ এর কথা ভেবে এজন্যই জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আজ থেকে ৫০ বছর আগে ১৯৭২ সালে কুমিল্লার এক জনসভায় বলেছিলেন,‘মাছ হবে দ্বিতীয় প্রধান বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী সম্পদ’।


আর এই সম্ভাবনাময় সম্পদ সম্পর্কে জনগণকে সচেতন ও সম্পৃক্ত করতে প্রতিবারের ন্যায় এবারো নানা আয়োজনের মাধ্যমে পালিত হচ্ছে “জাতীয় মৎস্য সপ্তাহ-২০২২”। “নিরাপদ মাছে ভরবো দেশ, বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ” এ প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে ২৩ জুলাই শুরু হচ্ছেজাতীয় মৎস্য সপ্তাহ । চলবে ২৯ জুলাই পর্যন্ত ।


বাংলাদেশের আর্থসামাজিক অগ্রগতি, গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থান সৃষ্টি,প্রাণিজ আমিষের চাহিদা মেটাতে ও অর্থনীতির চাকাকে সচল রাখতে এবং দারিদ্র্য দূরীকরণে মৎস্যখাত গুরূত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে। সরকারের সময়োপযোগী পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়নের ফলে বাংলাদেশ মাছ উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে। বর্তমানে দেশের মোট জিডিপি’র শতকরা ৩ দশমিক ৫৭ ভাগ, কৃষিজ জিডিপি’র শতকরা ২৬ দশমিক ৫০ ভাগ এবং মোট রপ্তানি আয়ের শতকরা ১ দশমিক ২৪ ভাগ মৎস্যখাতের অবদান। মৎস্যখাতে জিডিপি’র প্রবৃদ্ধি শতকরা ৫দশমিক৭৪ ভাগ।


মৎস্য উৎপাদন বৃদ্ধির মাধ্যমে প্রাণিজ আমিষের সরবরাহ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সরকার নানা পদক্ষেপ গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করছে। উন্মুক্ত জলাশয়ে মাছ চাষ, বিপন্নপ্রায় মৎস্য প্রজাতির সংরক্ষণ, মাছের প্রজনন ও বংশবৃদ্ধির জন্য অভয়াশ্রম সৃষ্টি, জাটকা সংরক্ষণ, মা ইলিশ সংরক্ষণ ও পরিবেশ বান্ধব চিংড়ি চাষ ইত্যাদি কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। মাছের উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে মৎস্য অধিদপ্তর চীন হতে বিশুদ্ধ জিনপুল সমৃদ্ধ ৩৮ হাজার ৪ শত ৬১টি চাইনিজ কার্প, যথা- সিলভার কার্প, গ্রাস কার্প ও বিগহেড কার্প আমদানি করেছে। বর্তমানে দেশের ৩৯টি সরকারি খামারে কৃত্রিম প্রজননের মাধ্যমে রেণু উৎপাদন করে এই মূল জাত পর্যায়ক্রমে দেশের সকল সরকারি বেসরকারি খামারে এবং চাষি পর্যায়ে সরবরাহ করা হচ্ছে।


মাছের উৎপাদনকে ত্বরান্বিত করতে প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজনন ক্ষেত্র হালদা নদীকে “ বঙ্গবন্ধু মৎস্য হেরিটেজ” ঘোষণা করা হয়েছে।এছাড়াও মাছের উৎপাদনকে ত্বরান্বিত ও টেকসই করতে,পাশাপাশি বর্তমান সরকারের আমার গ্রাম, আমার শহর এর কার্যক্রমকে এগিয়ে নিয়ে যেতে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় নেত্রকোনা জেলার সদর উপজেলার ‘দক্ষিণ বিশিউড়া’ ও শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলার ‘হালইসার’ গ্রামকে ‘ফিশার ভিলেজ’ বা ‘মৎস্য গ্রাম’ ঘোষণা করেছে।

এছাড়া সাসটেইনেবল কোস্টাল এন্ড মেরিন ফিসারিজ প্রজেক্ট ইন বাংলাদেশ প্রকল্পের আওতায় প্রকল্প এলাকায় ১০০টি মডেল ভিলেজ প্রতিষ্ঠা ও ৪৫০টি মৎস্যজীবী গ্রাম উন্নয়ন করা হচ্ছে। পাশাপাশি মৎস্য ও মৎস্যজাত পণ্য রপ্তানির বাজার সংরক্ষণ ও সম্প্রসারণের জন্য মাননিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। গ্রামীন মৎস্য চাষী ও জেলেদের তথ্যপ্রযুক্তির সাথে সম্পৃক্তকরণের লক্ষ্যে দেশব্যাপী জেলে নিবন্ধন ও পরিচয়পত্র প্রদান এবং ডাটাবেজ তৈরির কাজ চলমান রয়েছে। মৎস্যখাতে সরকার কর্তৃক গৃহীত সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা ও উন্নয়ন প্রকল্পসমুহের বাস্তবায়নের ফলে ২০২০-২১ অর্থ বছরে মাছ উৎপাদিত হয়েছে ৪৬.২১ লক্ষ মেট্রিক টন, যা ২০১০-১১ অর্থ বছরের মোট উৎপাদনের (৩০.৬২ লক্ষ মেট্রিক টন) তুলনায় ৫০. ৯১ শতাংশ বেশি। তাছাড়া ১৯৮৩-৮৪ অর্থ বছরে মাছের উৎপাদন ছিলো৭.৫৪ লক্ষ মেট্রিক টন। গত ৩৮ বছরে মাছের উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে ৬ গুণের অধিক (অ.স ২০২২)।


মাছের উৎপাদন বাড়াতে সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় জাটকা রক্ষায় ফেব্রুয়ারি হতে মে পর্যন্ত পরিবার প্রতি মাসিক ৪০ কেজি এবং ইলিশের প্রধান প্রজনন মৌসুমে ২২ দিনের জন্য পরিবার প্রতি ২০ কেজি হারে চাল প্রদান করা হয়। ২০২১-২২ অর্থ বছরে জাটকা ও মা ইলিশ আহরণ নিষিদ্ধ সময়ে ৯ লক্ষ ৪৬ হাজার ৬৪৪টি জেলে পরিবারকে মোট ৭০ হাজার ২ শত ৬০ মেট্রিক টন চাল বিতরণ করা হয়েছে।


এছাড়া ৬৫ দিন সামুদ্রিক মাছ ধরা নিষিদ্ধকালীন গত বছরের ন্যায় ২০২১-২২ অর্থবছরেও দেশের ১৪ টি জেলার ৬৮ টি উপজেলার ২ লক্ষ ৯৯ হাজার ১ শত ৩৫ টি জেলে পরিবারকে মাসিক ৪০ কেজি হারে ১ম কিস্তিতে প্রায় ১৬ হাজার ৭ শত ৯১ মেট্রিক টন ভিজিএফ (চাল) বিতরণ করা হয়েছে।


জনবহুল বাংলাদেশের খাদ্য চাহিদা মিটাতে, কলকারখানার বর্জ্য, ফসলি জমিতে কীটনাশক ও সারের মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহারের ফলে নদী দূষণ এবং অতিরিক্ত মাছ আহরণসহ নানা কারণে দেশি মাছের অনেক প্রজাতি বিলুপ্ত হয়ে গেছে। আরও বহু প্রজাতি হুমকির মুখে রয়েছে। মিঠাপানির ২৬০ প্রজাতির মাছের মধ্যে ১৪৩টি ছোট প্রজাতির। এর মধ্যে ৬৪টি মাছ বিলুপ্ত হয়ে গেছে। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অবস্থা বদলাতে শুরু করেছে।সরকারের পাশাপাশি, গবেষণা প্রতিষ্ঠান গুলোও মাছের উৎপাদন বৃদ্ধিতে এবং বিলুপ্ত প্রজাতির মাছকে আমাদের খাবার প্লেটে পুণরায় ফিরিয়ে আনতে নিরলস গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছে। গত ২১ বছরে ৩১টি দেশি মাছের চাষপদ্ধতি উদ্ভাবন করে মৎস্যচাষিদের হাতে তুলে দিয়েছেন বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিজ্ঞানীরা।এর মধ্যে চলতি বছরেই ১০টি দেশি মাছের জাত বদ্ধ জলাশয়ে চাষ করে উৎপাদন বাড়ানোর উপায় বের করা হয়েছে।

সফলতার ধারাবাহিকতায় ৩১তম মাছ হিসেবে গতবছরের ২৫ আগস্ট যুক্ত হয় কাকিলা মাছ। এ মাছটির কৃত্রিম প্রজনন বাংলাদেশেই প্রথম। পাবদা, গুলশা, গুজি আইড়, রাজপুঁটি, চিতল, মেনি, ট্যাংরা, ফলি, বালাচাটা, শিং, মহাশোল, গুতুম, মাগুর, বৈরালি, কুচিয়া, ভাগনা, খলিশা, কালবাউশ, কই, বাটা, গজার, সরপুঁটি, গনিয়া, জাইতপুঁটি, পিয়ালি, বাতাসি, রানী, ঢেলা ও কাকিলা- এই ৩১ প্রজাতির মাছ আবার ফিরিয়ে এনেছে প্রতিষ্ঠানটি। এর মধ্যে ট্যাংরা মাছের দুই রকম জাত রয়েছে। প্রায় এক যুগের প্রচেষ্টায় ২০২১ সালের জুন মাসে রুই মাছের নতুন জাত “সুবর্ণ রুই” উদ্ভাবন করা হয়েছে। এছাড়া মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের লাইভ জিন ব্যাংকে দেশের বিলুপ্তপ্রায় ৮৯ প্রজাতির দেশীয় মাছ সংরক্ষণ করা হয়েছে। গবেষক, চাষি ও উদ্যোক্তারা যেন সহজেই এ মাছগুলো পেতে পারেন- সে কারণেই এ প্রচেষ্টা।


বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, গবেষণাকাজে সাফল্য আসায় গত ১১ বছরে দেশি ছোট মাছের উৎপাদন প্রায় সাড়ে চার গুণ বেড়েছে। ২০০৯ সালে পুকুরে চাষের মাধ্যমে দেশি ছোট মাছের মোট উৎপাদন ছিল ৬৭ হাজার ৩৪০ টন, যা ২০১৭-১৮ অর্থবছরে প্রায় তিন লাখ টনে উন্নীত হয়েছে। আমাদের দেশে মৎস্য উৎপাদনে দেশি ছোট মাছের অবদান শতকরা ৩০-৩৫ ভাগ।প্রাচীনকাল থেকে দেশীয় প্রজাতির মাছ আমাদের সহজলভ্য পুষ্টির অন্যতম উৎস হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। এর মধ্যে মলা, ঢেলা, পুঁটি, বাইম, টেংরা, খলিশা, পাবদা, শিং, মাগুর, কেচকি, চান্দা ইত্যাদি অন্যতম। এসব মাছে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন, ক্যালসিয়াম, ফসফরাস, লৌহ ও আয়োডিনের মতো প্রয়োজনীয় খনিজ পদার্থ রয়েছে। এসব উপাদান শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করে তোলে এবং রক্তশূন্যতা, গলগণ্ড, অন্ধত্ব প্রভৃতি রোগ প্রতিরোধে সহায়তা করে।


সর্বোপুরি বলা যায়, মাছ আমাদের দেশে প্রাণিজ আমিষের প্রধান উৎস। বর্তমানে দেশে মাথাপিছু মাছ গ্রহণের পরিমাণ দৈনিক ৬২ দশমিক ৫৮ গ্রাম।সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে মাছের উৎপাদন বাড়িয়ে ৪৬ লাখ মেট্রিক টন থেকে ৬৫ লাখ মেট্রিক টনে ও ২০৪০ সালের মধ্যে ৮৫ লাখ মেট্রিক টনে উন্নীত করতে চায়। খাদ্যনিরাপত্তা সরকারের অন্যতম প্রধান এজেন্ডা। কেবল খাদ্যের প্রাপ্যতা নয়, ব্যালেন্স ডায়েট নিশ্চিত করাই সরকারের লক্ষ্য। কারণ, এটি ছাড়া কখনোই বাংলাদেশের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত হবে না। এবং এসডিজি অর্জন করা যাবে না। মৎস্য খাতকে অগ্রাধিকার না দিলে এর সঙ্গে সম্পৃক্ত পাঁচটি সাস্টেইন্যাবল ডেভেলপমেন্ট গোল(এসডিজি) কখনোই অর্জন করা যাবে না। তাই ২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে সমৃদ্ধ ও উন্নত দেশে রূপান্তর করতে মৎস্য খাত গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে কাজ করবে।

লেখক: কৃষিবিদ মো.সামছুল আলম
গণযোগাযোগ কর্মকর্তা
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ তথ্য দপ্তর

গৌরব, আত্মমর্যাদা ও আত্মবিশ্বাসের পদ্মা সেতু
                                  


খুলে গেল স্বপ্নের সেতুর দুয়ার। দেশজুড়ে সাধারণ মানুষের মনে বইছে আনন্দের জোয়ার। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতার পর বাঙালি জাতির এ যেন আরেক বিজয়! ১৯৭১ সালে টানা ৯ মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধরে পর যখন বাংলাদেশ নামে রাষ্ট্রটি বিশ্ব মানচিত্রে জায়গা পায় তখন বাঙালি আনন্দে মাতোয়ারা হয়ে উঠেছিল। সেই আনন্দে মিশে ছিল গৌরব, সন্মান এবং সব হারিয়ে নতুন করে আত্মমর্যাদা নিয়ে বাঁচার স্বপ্ন। মানুষের মুখে মুখে ছিল তখন ‘জয় বাংলা’ ধ্বনি। সেই বিজয়ের অর্ধশত বছর পর পদ্মা সেতু নির্মাণের মাধ্যমে দেশবাসী আরেকটি বিজয় পেল। এই বিজয়েও মিশে আছে গৌরব, আত্মমর্যাদা এবং আত্মবিশ্বাস।

বাংলাদেশের নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু হয়েছে ভাবতেই মনে পুলক জাগে! তবে আজ এই সময়ে দাঁড়িয়ে পদ্মা সেতু নিয়ে যতটা সাফল্য আমরা উপলব্ধি করছি তা সহজ ছিল না। প্রকল্পের শুরুতেই দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রে থমকে যায় এই স্বপ্নের সেতু নির্মাণের কাজ। ২০১১ সালের ১১ অক্টোবর। মনে পড়ে সেই দিনের কথা- যেদিন একটি জাতীয় দৈনিকের শিরোনাম ছিল- ‘পদ্মাসেতু হচ্ছে না’।

২০১৮ সালের ২ জানুয়ারি ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউটের হলরুমে ছাত্রদলের ৩৯তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া বলেছিলেন, পদ্মা সেতুর স্বপ্ন দেখাচ্ছে সরকার। কিন্তু পদ্মা সেতু আওয়ামী লীগের আমলে হবে না। এ সেতু জোড়া তালি দিয়ে বানানো হচ্ছে। এ সেতুতে কেউ উঠবেন না। শুধু তাই নয়, ‘পদ্মা সেতুতে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়ন বাতিল করায় পদ্মা সেতু না হওয়ার জন্য সরকার, প্রধানমন্ত্রী এবং প্রধানমন্ত্রীর পরিবার দায়ী। আমরা ক্ষমতায় এলে একটা নয়, দুটি পদ্মা সেতু বানাবো (দৈনিক মানবজমিন, ৩০ জুন ২০১২)। এ ধরনের কথাও খালেদা জিয়া বলেছেন। তার সঙ্গে তখন সুর মিলিয়ে বলার লোকের অভাব ছিল না। ব্যারিস্টার মওদুদ বলেছিলেন, ‘পদ্মা সেতু বানানোর কোনও ইচ্ছা সরকারের ছিল না। তাদের লক্ষ্য ছিল লুটপাট। নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু করার কল্পনা বিলাস বাদ দিন।’ (দৈনিক ইত্তেফাক, ১১ জুলাই, ২০১২)।

বিশ্বব্যাংক যখন ২০১২ সালের ২৯ জুন নানা ধরনের বায়বীয় অজুহাতে পদ্মা সেতুতে প্রত্যাশিত ঋণ বাতিল করে, একই বছর ৮ জুলাই সংসদে দাঁড়িয়ে প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা ঘোষণা করেন বাংলাদেশ তার নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণ করবে। তাঁর এই ঘোষণাতে চারদিকে বেশ হাস্যরোল সৃষ্টি হয়েছিল। এসব হাস্যরোল তোয়াক্কা না করেই শুরু হয় পদ্মা সেতু নির্মাণের কাজ। কিন্তু ষড়যন্ত্রকারীদের ষড়যন্ত্র থেমে থাকেনি। ষড়যন্ত্রকারীদের ষড়যন্ত্রে ২০১২ সালের ২৩ জুলাই পদ্মা সেতু প্রকল্পে দুর্নীতির অভিযোগ ওঠায় তৎকালীন যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেন পদত্যাগ করেছিলেন। সরকার সেতু প্রকল্পের পরামর্শকের দায়িত্ব থেকে অপসারণ করে সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আবুল হাসান চৌধুরীকেও।

সেই সময়ে কানাডিয়ান প্রতিষ্ঠান এসএনসি লাভালিনকে পদ্মা সেতুর পরামর্শকের কাজ পাইয়ে দিতে ঘুষ লেনদেনের অভিযোগে বিশ্বব্যাংকের চাপে সেতু বিভাগের সচিবসহ সাতজনের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। সেই মামলায় গ্রেপ্তার হন সেতু বিভাগের সাবেক সচিব মোশারফ হোসেন ভূঁইয়া। যদিও পরে সেই অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণিত হয়। কানাডার আদালতে হওয়া মামলায় প্রমাণিত হয় পদ্মা সেতু প্রকল্পে কোনো দুর্নীতি হয়নি। যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেন, সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আবুল হাসান চৌধুরী, সেতু সচিব মোশারফ হোসেন ভূঁইয়াসহ বাকি অভিযুক্তরা নির্দোষ প্রমাণিত হন। তাদের বিরুদ্ধে আদালতে যে অভিযোগ তোলা হয় সেটিকে ‘মিথ্যা’ আখ্যা দেয় কানাডার আদালত।

মূল সেতু নির্মাণ এবং নদী শাসনের কাজ শুরুর পর থেকেই নানা চ্যালেঞ্জ এসেছে। কখনো পদ্মার ভাঙন, আবার কখনো কারিগরি জটিলতায় কাজ আটকে গেছে। মডিফাই করতে হয়েছে নকশায়। কিন্তু কাজ থেমে থাকেনি। ২০১৪ সালের নভেম্বরে কাজ শুরুর পরের বছরেই মাওয়ায় স্থাপিত নির্মাণ মাঠের বেচিং প্ল্যান্টসহ একাংশ নদীভাঙনে বিলীন হয়ে যায়। ২০১৭ সালের দিকে স্রোতের কারণে মাওয়ায় নদীর তলদেশে গভীর খাদ তৈরি হয়। এ ছাড়া মাওয়া ও জাজিরা প্রান্তে বিভিন্ন সময় ভাঙন দেখা দেয়। ফলে নদীশাসনের কাজে ব্যাঘাত ঘটে। ওই বছর ৩১ জুলাই মুন্সীগঞ্জের লৌহজং উপজেলার কুমারভোগের কনস্ট্রাকশন এরিয়ার কিছু অংশে ভাঙন দেখা দেয়। ওইদিন কনস্ট্রাকশন ইয়ার্ডে থাকা অনেক মালামাল নদীতে বিলীন হয়ে যায়।

২০১৭ সালে সেতুর খুঁটি বসানোর সময় ডিজাইনে থাকা ২২টি খুঁটির নিচে মাটি পরীক্ষায় নরম মাটি পাওয়া যায়। তখন নকশা সংশোধনের প্রয়োজন দেখা দেয়। শুরুতে প্রতিটি পিয়ারের নিচে ছয়টি করে পাইল (মাটির গভীরে স্টিলের ভিত্তি বসানো) বসানোর পরিকল্পনা থাকলেও নকশা সংশোধন করে একটি করে পাইল বাড়িয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। এর কারণে খুঁটি নির্মাণকাজ পুরোপুরি শেষ হতে ঐ বছরের মার্চ পর্যন্ত লেগে যায়। এতে বাড়তি সময় লাগে এক বছর। এ কারণে ওই সময় কাজের কিছুটা গতি হারায়।

কত ষড়যন্ত্র, কত মিথ্যাচার! কোনো কিছুই দমাতে পারেনি শেখ হাসিনাকে। দেশি-বিদেশি নানা ষড়যন্ত্র আর বিশ্বব্যাংক সেতু নির্মাণ প্রকল্প থেকে সরে যাওয়ার পর যে সেতু কল্পনায় ছিল না, সেই পদ্মা সেতু এখন দৃষ্টিসীমায় দিগন্তজুড়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে। কোনো ষড়যন্ত্রই পদ্মা সেতুর পথ রোধ করতে পারেনি। নিন্দুক আর ষড়যন্ত্রকারীদের মুখে ছাই দিয়ে ২৫ জুন ৬.১৫০ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের এই সেতু দেশের পিছিয়ে পড়া ২১ জেলাকে জাগিয়ে তুলতে উম্মুক্ত হলো। শুধু বাংলাদেশ নয়, আন্তর্জাতিক মিড়িয়াগুলোতে প্রশংসার জোয়ারে ভাসছেন শেখ হাসিনা।

মনে পড়ে ১৯৭১ সালের কথা। মানুষ যখন পাকিস্তানিদের শোষণ থেকে মুক্ত হওয়ার কথা কল্পনাও করেনি। যখন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাঙালি জাতিকে আশা জাগিয়েছে মুক্তির, স্বাধীনতার। তখনও রাজাকার বাহিনী এ নিয়ে কটূক্তি করেছে, ষড়যন্ত্র করে বঙ্গবন্ধুকে দমাতে চেয়েছে। কিন্তু সব ষড়যন্ত্রকে মোকাবিলা করে বাঙালি জাতিকে অনুপ্রেরণা দিয়ে এ জাতিকে এক কাতারে এনে পাকিস্তানি শোষণের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে বিজয় ছিনিয়ে এনেছিল। ঠিক বর্তমান সময়ে শেখ হাসিনা যেন বঙ্গবন্ধুরই প্রতিচ্ছবি। বঙ্গবন্ধু যেমন যে কোনো সিদ্ধান্তে পিছ পা হতেন না, তেমনি শেখ হাসিনাও। তার প্রমাণ এই পদ্মা সেতু।

শেখ হাসিনা আমাদের এমন এক সেতু উপহার দিয়েছেন যে সেতু  বিশ্ব রেকর্ডও করেছে। প্রথম বিশ্ব রেকর্ডটি হলো- মাটির ১২০ থেকে ১২২ মিটার গভীরে গিয়ে পাইল বসানো। পৃথিবীর অন্য কোথাও কোনো সেতুতে পাইল এত গভীরে প্রবেশ করাতে হয়নি। দ্বিতীয় রেকর্ড হলো, ভূমিকম্পের বিয়ারিং-সংক্রান্ত। এই সেতুতে ‘ফ্রিকশন পেন্ডুলাম বিয়ারিংয়ের’ সক্ষমতা হচ্ছে ১০ হাজার টন। এখন পর্যন্ত বিশ্বের কোনো সেতুতে এমন সক্ষমতার বিয়ারিং লাগানো হয়নি। রিখটার স্কেলে ৯ মাত্রার ভূমিকম্পে টিকে থাকার মতো করে পদ্মা সেতু নির্মাণ হয়েছে। এর পরের বিশ্ব রেকর্ড হলো, পিলার এবং স্প্যানের মাঝে যে বেয়ারিং থাকে সেটি। এখানে ১০ হাজার ৫০০ মেট্রিক টন ওজনের একেকটি বেয়ারিং ব্যবহৃত হয়েছে। পৃথিবীতে এর আগে এমন বড় বেয়ারিং ব্যবহার করা হয়নি কোনো সেতুতে। অন্য রেকর্ডটি হলো নদী শাসন সংক্রান্ত। ১৪ কিলোমিটার এলাকা নদী শাসনের আওতায় আনা হয়েছে। এই নদী শাসনে খরচ হয়েছে ৯ হাজার ৪০০ কোটি টাকারও বেশি।

এক সময় যুক্তরাষ্ট্রের হেনরি কিসিঞ্জার বলেছিলেন, বাংলাদেশ হলো ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’র দেশ। গার্মেন্টস শিল্পসহ নানা কারণে ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’র দেশের সেই অপবাদ অনেক আগেই ঘুঁচে গেছে। বিশ্ব আজ চিনেছে বাংলাদেশ নামক একটি দেশ আছে যে দেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। যার নেতৃত্বে অনেক উন্নয়নশীল দেশও তার নেতৃত্বের বিচক্ষণতায় পিছিয়ে পড়েছে।

শেখ হাসিনার একক সিদ্ধান্তে পদ্মা সেতু আজ দৃশ্যমান। শেখ হাসিনা প্রমাণ করেছেন পদ্মা সেতু বাঙালিকে  দাবিয়ে না রাখতে পারার প্রতীক। ষড়যন্ত্রকারীরা এখনও ষড়যন্ত্র চালিয়ে যাচ্ছে কিন্তু তাতে লাভ নেই। মানুষ এখন বুঝে গেছে শেখ হাসিনা শুধু মুখে বলেন না। কাজে প্রমাণ দেন।

লেখক: সাজ্জাদ হোসেন চিশতী
গণমাধ্যম কর্মী


   Page 1 of 12
     উপসম্পাদকীয়
মহাষষ্ঠীর মধ্য দিয়ে শুরু শারদীয় দুর্গোৎসব
.............................................................................................
জিপিএ ফাইভ, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় আর বিসিএসের নামই কি সফলতা!
.............................................................................................
আমাদের সংস্কৃতির সঙ্গে মৃৎশিল্প
.............................................................................................
কেন ভর্তি হবেন ফিন্যান্স ও ব্যাংকিং বিভাগে
.............................................................................................
বাংলাদেশ ও জ্বালানি তেল
.............................................................................................
বিদ্রোহী কাজী নজরুল
.............................................................................................
চা শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি ও মানবাধিকার প্রদান করতে হবে
.............................................................................................
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় : প্রজন্মে প্রজন্মের যাত্রা
.............................................................................................
২১ আগস্ট ১৫ আগস্টেরই ধারাবাহিকতা
.............................................................................................
পারিবারিক ব্যবস্থা ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে: নেপথ্যে কারণ...
.............................................................................................
ভয়াবহ একটি দিবস ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট
.............................................................................................
১২ আগস্ট আন্তর্জাতিক যুব দিবস : বাংলাদেশ উন্নত বিনির্মাণের প্রকৃত কারিগর যুবকেরা
.............................................................................................
বৃদ্ধাশ্রম নয় বরং প্রয়োজন সন্তানের ভালোবাসার
.............................................................................................
শত বাঁধা পেরিয়েও এগিয়ে যাচ্ছে জবি
.............................................................................................
নিরাপদ মাছে ভরবো দেশ, বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ
.............................................................................................
গৌরব, আত্মমর্যাদা ও আত্মবিশ্বাসের পদ্মা সেতু
.............................................................................................
আত্মহত্যাকে না বলি জীবনকে উপভোগ করতে শিখি
.............................................................................................
আত্মহত্যা নয়, বেঁচে থাকায় জীবন
.............................................................................................
আপোষহীন আবুল মাল মুহিত
.............................................................................................
প্রস্তাবিত গণমাধ্যমকর্মী আইন ‘কাটা ঘায়ে নুনের ছিটা’
.............................................................................................
রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে বঙ্গবন্ধু
.............................................................................................
জগন্নাথের গর্ব ভাষা শহীদ রফিক
.............................................................................................
ডেল্টা প্ল্যান ২১০০ এবং সম্ভাব্য প্রস্তুতি
.............................................................................................
দেশকে এগিয়ে নিতে ছিন্নমূল পথশিশুদের পুনর্বাসন করতে হবে
.............................................................................................
বাংলাদেশ, বঙ্গবন্ধু ও ছাত্রলীগ একটি অপরটির পরিপূরক
.............................................................................................
টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের পূর্বশর্ত স্বতস্ফুর্ত অংশগ্রহন
.............................................................................................
ইউপি নির্বাচন : দলীয় প্রতীক তৃণমূলে দলের বারোটা বাজিয়ে দিচ্ছে!
.............................................................................................
টিকটক এবং সামাজিক অবক্ষয়
.............................................................................................
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্প
.............................................................................................
করোনায় বেকারদের অবস্থা শোচনীয়
.............................................................................................
অবক্ষয়ের নতুন ফাঁদ ‌টিকটক
.............................................................................................
রাষ্ট্র, আইন এবং রোজিনারা
.............................................................................................
পথশিশুরাও মানুষ
.............................................................................................
অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও চর উন্নয়ন
.............................................................................................
নির্ভীক পদচারণার ৫০ বছর
.............................................................................................
সর্বত্র জয় হোক বাংলা ভাষার
.............................................................................................
বাঙালির চেতনা ও প্রেরণার প্রতীক একুশে ফেব্রুয়ারি
.............................................................................................
সড়ক দুর্ঘটনামুক্ত বাংলাদেশ চাই
.............................................................................................
দেশের অর্থনীতির চাকা ঘুরাতে পর্যটন শিল্প হতে পারে অন্যতম হাতিয়ার
.............................................................................................
প্রয়োজন দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন, নৈতিকতা ও মূল্যবোধ চর্চা
.............................................................................................
এইচএসসি পরীক্ষা বাতিল: লাভ-ক্ষতির হিসাব-নিকাশ ও গৃহীত পদক্ষেপ
.............................................................................................
সুনীল অর্থনীতি এবং বাংলাদেশের নতুন দিগন্ত উন্মোচন
.............................................................................................
নারীবাদ ও বর্তমান প্রেক্ষাপট
.............................................................................................
সামাজিক অবক্ষয়ের ব্যাপকতায় কলুষিত সমাজ ব্যবস্থা
.............................................................................................
আসুন মাদকমুক্ত সমাজ গড়ি
.............................................................................................
শোক সন্তপ্ত ১৫ই আগস্টঃ একটি কালো অধ্যায়
.............................................................................................
হৃদয়ের নিভৃত কন্দরে বঙ্গবন্ধু অমলিন
.............................................................................................
যুক্তরাষ্ট্র-চীন উত্তেজনার শেষ কোথায়
.............................................................................................
প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলায় কতটুক প্রস্তুত বাংলাদেশ?
.............................................................................................
লাশের দেশ বাংলাদেশ
.............................................................................................

|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|

সম্পাদক ও প্রকাশক : মোহাম্মদ আখলাকুল আম্বিয়া
নির্বাহী সম্পাদক: মাে: মাহবুবুল আম্বিয়া
যুগ্ম সম্পাদক: প্রদ্যুৎ কুমার তালুকদার

সম্পাদকীয় ও বাণিজ্যিক কার্যালয়: স্বাধীনতা ভবন (৩য় তলা), ৮৮ মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকা, ঢাকা-১০০০। Editorial & Commercial Office: Swadhinota Bhaban (2nd Floor), 88 Motijheel, Dhaka-1000.
সম্পাদক কর্তৃক রঙতুলি প্রিন্টার্স ১৯৩/ডি, মমতাজ ম্যানশন, ফকিরাপুল কালভার্ট রোড, মতিঝিল, ঢাকা-১০০০ থেকে মুদ্রিত ও প্রকাশিত ।
ফোন : ০২-৯৫৫২২৯১ মোবাইল: ০১৬৭০৬৬১৩৭৭

Phone: 02-9552291 Mobile: +8801670 661377
ই-মেইল : dailyswadhinbangla@gmail.com , editor@dailyswadhinbangla.com, news@dailyswadhinbangla.com

 

    2015 @ All Right Reserved By dailyswadhinbangla.com

Developed By: Dynamic Solution IT