শুক্রবার, ২২ অক্টোবর 2021 বাংলার জন্য ক্লিক করুন
  
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|

   শিল্প সাহিত্য -
                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                 
সামাজিক দূরত্ব নাকি শারীরিক দূরত্ব?

মহামারী করোনা ভাইরাস প্রাদুর্ভাবের পর থেকে কখনো ‘শারীরিক দূরত্ব’ আবার কখনো ‘সামাজিক দূরত্ব’ প্রত্যয় দুটি ব্যবহার করা হচ্ছে। তবে এটি নিয়ে যে কোন মতপার্থক্য নেই এমনটি নয়। ইতোমধ্যে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলেছে এটি শারীরিক দূরত্ব, সামাজিক দূরত্ব নয়। সুক্ষ্ম কিন্তু বিশ্লেষণধর্মী বিষয় দু’টি সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা থাকা দরকার। সমাজবিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে সামাজিক দূরত্ব বলতে সাধারণত বিভিন্ন গোষ্ঠী  বা শ্রেণি একে অপরের থেকে দূরত্বে অবস্থান করা বুঝায়। সামাজিক দূরত্ব বিষয়টি সম্পর্কে ধারণা স্পষ্ট করতে ভারতীয় জাতিভেদ প্রথার উদাহরণ যথেষ্ট হবে। ভারতীয় বর্ণপ্রথা অনুযায়ী নিম্ন শ্রেণির মানুষ, অর্থাৎ বৈশ্য ও শুদ্র, উচ্চ শ্রেণিতে থাকা ব্রাহ্মণ ও ক্ষত্রিয়দের সাথে সম্পর্ক রাখতে পারে না। তাদের উচ্চ ও নিম্ন বর্ণের মধ্যে বিয়ে, আদান প্রদান তো নেই বরং এমনও নিয়ম আছে নিম্ন বর্ণের কোন ব্যক্তির ছায়া যদি উচ্চ বর্ণের কেউ মাড়ায় তবে তাকে গোসল করার মাধ্যমে পবিত্র হতে হবে। এখানে নিম্ন বর্ণ এবং উচ্চ বর্ণের মাঝে যে পার্থক্য পরিলক্ষিত হয় তাকে সমাজবিজ্ঞানীরা সামাজিক দূরত্ব বলেছেন।

অন্যদিকে শারীরিক দূরত্ব বলতে কোন একজন ব্যক্তি থেকে কিছুটা দূরে অবস্থান করা বোঝায়। যেমন সাধারণত আমাদের পরিবারে কারো ফ্লু হলে সে সদস্য থেকে আমরা কিছুটা দূরত্ব মেনে চলার চেষ্টা করি। এটি কেবলমাত্র কিছু সময়ের জন্য ব্যক্তি থেকে দূরে অবস্থান করা বুঝায়, যা সামাজিক দূরত্ব নয় বরং শারীরিক দূরত্ব।

আলোচ্য দুটি বিষয়ের মধ্যে যুক্তিশীল পার্থক্য তুলে ধরেছেন জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর ড. এ এইচ এম মোস্তাফিজুর রহমান। তিনি বলেন, করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের পর সামাজিক দূরত্ব কথাটি খুব বেশি ব্যবহৃত হচ্ছে। তবে মহামারি প্রেক্ষিতে ব্যবহারের জন্য কথাটি সামাজিক দূরত্ব নয় বরং শারীরিক দূরত্ব হবে। অর্থাৎ মহামারি থেকে রক্ষা পেতে আমাদেরকে শারীরিক নৈকট্য পরিহার করতে হবে। সংক্রমণ থেকে বাঁচতে সংক্রমিত ব্যক্তি থেকে তিন বা চার ফুট দূরে অবস্থান করতে হবে। এক্ষেত্রে শারীরিক দূরত্ব কথাটি ব্যবহার করতে হবে। কারণ সমাজবিজ্ঞানে সামাজিক দূরত্ব বলতে, একটি বর্ণ থেকে অন্য একটি বর্ণ কিংবা একটি গোষ্ঠী থেকে অন্য একটি গোষ্ঠীর মধ্যে বিভিন্ন ক্ষেত্রে বৈষম্য তৈরী করা বোঝায়। উদাহরণস্বরূপ  সাদা-কালো ভেদাভেদ কিংবা উচ্চ, মধ্যম ও নিম্ন শ্রেণীর মধ্যে বৈষম্য। সামাজিক দূরত্ব এটা নয় যে একজন ব্যক্তি অন্য একজন ব্যক্তি থেকে অসুস্থতা বা কোন শারীরিক সমস্যার কারণে দূরে অবস্থান করবে। তবে ক্ষুদ্র অর্থে সামাজিক দূরত্ব বলা যেতে পারে, যখন আমরা খুব বেশি ভিড়ের মধ্যে যাচ্ছি না অথবা বাসে, ট্রেনে কিছুটা দূরত্ব বজায় রাখছি। তবে বিজ্ঞানসম্মত চিন্তাকল্পে এটি শারীরিক দূরত্ব, সামাজিক দূরত্ব নয়। কারণ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার রিপোর্টে বলা হয়েছে এটি হওয়া উচিত শারীরিক দূরত্ব, সামাজিক নয়। আলোচ্য প্রত্যয়টি সামাজিক দূরত্ব হওয়া উচিত নয় তার অন্যতম একটি কারণ সামাজিক দূরত্ব আমাদেরকে পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন করবে, মানসিকভাবে একাকীত্ব সৃষ্টি করবে এটা কাম্য নয়। আমাদের উচিত শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখা। বৈশ্বিক মহামারির এ সময়ে  আমরা যদি সামাজিক দূরত্ব সৃষ্টি করি তাহলে আমরা বিভিন্ন গ্রুপ, দল, সংগঠন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বো। এছাড়াও সামাজিক দূরত্ব সৃষ্টি হলে ক্রমে আমাদের সামাজিক সংহতি নষ্ট হতে শুরু করবে। ‘শারীরিক দূরত্ব’ কথাটি আমরা সাধারণত তখনই ব্যবহার করি যখন আক্রান্ত ব্যক্তির মাধ্যমে সংক্রমিত হওয়ার ভয় থাকে।

সুতরাং করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ থেকে বাঁচতে সামাজিক দূরত্ব কথাটি সমাজবিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে ভুল ভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে। করোনা মহামারি থেকে খুব শীঘ্রই একেবারে মুক্ত হওয়া যাবে কথাটি বলা শক্ত। হয়তো অন্য ভাইরাসগুলোর সাথে যেভাবে মানিয়ে চলতে হচ্ছে করোনা ভাইরাসের সাথে সেভাবে চলতে হবে। তাই সামাজিক দূরত্ব প্রত্যয়টি সর্বদা ভুলভাবে ব্যবহৃত হতে থাকলে সমাজবিজ্ঞানীদের কাছে বিভ্রান্তির সৃষ্টি হবে। তাই মহামারি প্রেক্ষিতে সামাজিক দূরত্ব কথাটি ব্যবহার করা ঠিক হবে না, শারীরিক দূরত্ব কথাটি ব্যবহার করতে হবে। এক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষের এখনই ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে এবং সঠিক শব্দটি নির্বাচন করতে হবে।’

মুতাসিম বিল্লাহ মাসুম
শিক্ষার্থী, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা

সামাজিক দূরত্ব নাকি শারীরিক দূরত্ব?
                                  

মহামারী করোনা ভাইরাস প্রাদুর্ভাবের পর থেকে কখনো ‘শারীরিক দূরত্ব’ আবার কখনো ‘সামাজিক দূরত্ব’ প্রত্যয় দুটি ব্যবহার করা হচ্ছে। তবে এটি নিয়ে যে কোন মতপার্থক্য নেই এমনটি নয়। ইতোমধ্যে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলেছে এটি শারীরিক দূরত্ব, সামাজিক দূরত্ব নয়। সুক্ষ্ম কিন্তু বিশ্লেষণধর্মী বিষয় দু’টি সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা থাকা দরকার। সমাজবিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে সামাজিক দূরত্ব বলতে সাধারণত বিভিন্ন গোষ্ঠী  বা শ্রেণি একে অপরের থেকে দূরত্বে অবস্থান করা বুঝায়। সামাজিক দূরত্ব বিষয়টি সম্পর্কে ধারণা স্পষ্ট করতে ভারতীয় জাতিভেদ প্রথার উদাহরণ যথেষ্ট হবে। ভারতীয় বর্ণপ্রথা অনুযায়ী নিম্ন শ্রেণির মানুষ, অর্থাৎ বৈশ্য ও শুদ্র, উচ্চ শ্রেণিতে থাকা ব্রাহ্মণ ও ক্ষত্রিয়দের সাথে সম্পর্ক রাখতে পারে না। তাদের উচ্চ ও নিম্ন বর্ণের মধ্যে বিয়ে, আদান প্রদান তো নেই বরং এমনও নিয়ম আছে নিম্ন বর্ণের কোন ব্যক্তির ছায়া যদি উচ্চ বর্ণের কেউ মাড়ায় তবে তাকে গোসল করার মাধ্যমে পবিত্র হতে হবে। এখানে নিম্ন বর্ণ এবং উচ্চ বর্ণের মাঝে যে পার্থক্য পরিলক্ষিত হয় তাকে সমাজবিজ্ঞানীরা সামাজিক দূরত্ব বলেছেন।

অন্যদিকে শারীরিক দূরত্ব বলতে কোন একজন ব্যক্তি থেকে কিছুটা দূরে অবস্থান করা বোঝায়। যেমন সাধারণত আমাদের পরিবারে কারো ফ্লু হলে সে সদস্য থেকে আমরা কিছুটা দূরত্ব মেনে চলার চেষ্টা করি। এটি কেবলমাত্র কিছু সময়ের জন্য ব্যক্তি থেকে দূরে অবস্থান করা বুঝায়, যা সামাজিক দূরত্ব নয় বরং শারীরিক দূরত্ব।

আলোচ্য দুটি বিষয়ের মধ্যে যুক্তিশীল পার্থক্য তুলে ধরেছেন জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর ড. এ এইচ এম মোস্তাফিজুর রহমান। তিনি বলেন, করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের পর সামাজিক দূরত্ব কথাটি খুব বেশি ব্যবহৃত হচ্ছে। তবে মহামারি প্রেক্ষিতে ব্যবহারের জন্য কথাটি সামাজিক দূরত্ব নয় বরং শারীরিক দূরত্ব হবে। অর্থাৎ মহামারি থেকে রক্ষা পেতে আমাদেরকে শারীরিক নৈকট্য পরিহার করতে হবে। সংক্রমণ থেকে বাঁচতে সংক্রমিত ব্যক্তি থেকে তিন বা চার ফুট দূরে অবস্থান করতে হবে। এক্ষেত্রে শারীরিক দূরত্ব কথাটি ব্যবহার করতে হবে। কারণ সমাজবিজ্ঞানে সামাজিক দূরত্ব বলতে, একটি বর্ণ থেকে অন্য একটি বর্ণ কিংবা একটি গোষ্ঠী থেকে অন্য একটি গোষ্ঠীর মধ্যে বিভিন্ন ক্ষেত্রে বৈষম্য তৈরী করা বোঝায়। উদাহরণস্বরূপ  সাদা-কালো ভেদাভেদ কিংবা উচ্চ, মধ্যম ও নিম্ন শ্রেণীর মধ্যে বৈষম্য। সামাজিক দূরত্ব এটা নয় যে একজন ব্যক্তি অন্য একজন ব্যক্তি থেকে অসুস্থতা বা কোন শারীরিক সমস্যার কারণে দূরে অবস্থান করবে। তবে ক্ষুদ্র অর্থে সামাজিক দূরত্ব বলা যেতে পারে, যখন আমরা খুব বেশি ভিড়ের মধ্যে যাচ্ছি না অথবা বাসে, ট্রেনে কিছুটা দূরত্ব বজায় রাখছি। তবে বিজ্ঞানসম্মত চিন্তাকল্পে এটি শারীরিক দূরত্ব, সামাজিক দূরত্ব নয়। কারণ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার রিপোর্টে বলা হয়েছে এটি হওয়া উচিত শারীরিক দূরত্ব, সামাজিক নয়। আলোচ্য প্রত্যয়টি সামাজিক দূরত্ব হওয়া উচিত নয় তার অন্যতম একটি কারণ সামাজিক দূরত্ব আমাদেরকে পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন করবে, মানসিকভাবে একাকীত্ব সৃষ্টি করবে এটা কাম্য নয়। আমাদের উচিত শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখা। বৈশ্বিক মহামারির এ সময়ে  আমরা যদি সামাজিক দূরত্ব সৃষ্টি করি তাহলে আমরা বিভিন্ন গ্রুপ, দল, সংগঠন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বো। এছাড়াও সামাজিক দূরত্ব সৃষ্টি হলে ক্রমে আমাদের সামাজিক সংহতি নষ্ট হতে শুরু করবে। ‘শারীরিক দূরত্ব’ কথাটি আমরা সাধারণত তখনই ব্যবহার করি যখন আক্রান্ত ব্যক্তির মাধ্যমে সংক্রমিত হওয়ার ভয় থাকে।

সুতরাং করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ থেকে বাঁচতে সামাজিক দূরত্ব কথাটি সমাজবিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে ভুল ভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে। করোনা মহামারি থেকে খুব শীঘ্রই একেবারে মুক্ত হওয়া যাবে কথাটি বলা শক্ত। হয়তো অন্য ভাইরাসগুলোর সাথে যেভাবে মানিয়ে চলতে হচ্ছে করোনা ভাইরাসের সাথে সেভাবে চলতে হবে। তাই সামাজিক দূরত্ব প্রত্যয়টি সর্বদা ভুলভাবে ব্যবহৃত হতে থাকলে সমাজবিজ্ঞানীদের কাছে বিভ্রান্তির সৃষ্টি হবে। তাই মহামারি প্রেক্ষিতে সামাজিক দূরত্ব কথাটি ব্যবহার করা ঠিক হবে না, শারীরিক দূরত্ব কথাটি ব্যবহার করতে হবে। এক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষের এখনই ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে এবং সঠিক শব্দটি নির্বাচন করতে হবে।’

মুতাসিম বিল্লাহ মাসুম
শিক্ষার্থী, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা

শুভ্রতার প্রতীক শরৎকাল
                                  

প্রকৃতিতে শরৎ এলো গুটি গুটি পায়ে নীরবে। ঝকঝকে নীলাকাশে সাদা মেঘের ভেলা উড়িয়ে বর্ষায় স্যাঁতসেঁতে  হয়ে যাওয়া মাঠ-ঘাটকে চাঙ্গা করতেই যেন শরতের এ আগমন। ষড়ঋতুর দেশ বাংলাদেশ। ভাদ্র-আশ্বিন এ দুই মাসকে বলা হয় শরৎকাল। গ্রাম বাংলার প্রকৃতিতে প্রথম থেকেই চোখে পড়ে মন মাতানো শরতের অপরূপ সৌন্দর্য। সূর্য ওঠার আগেই হালকা শিশির ভেজা ঘাসের  উপর ঝরে পড়ে শিউলি ফুল। ঝরা শিউলি ফুলের মনোমুগ্ধকর  চাহনি  সাড়া জাগায় প্রতিটি মানব হৃদয়ে। আনাচে-কানাচে, মাঠে-ঘাটে-প্রান্তরে শুভ্রতা ছড়ায় সাদা কাশফুল। গাছে গাছে দেখা যায় বাহারী জাতের ফল। জলপাই, তাল, আমলকী, চালতা, করমচা পাওয়া যায় শরৎকালে। শরতের শ্বেত-শুভ্র রূপে স্নিগ্ধ হয়ে ওঠে বাংলার প্রকৃতি। শরতের সৌন্দর্যে বিমোহিত হয়েই কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছেন,

আজি কি তোমার মধুর মূরতি
হেরিনু শারদ প্রভাতে!
হে মাত বঙ্গ, শ্যামল অঙ্গ ঝলিছে অমল শোভাতে।

বাংলার এমন অনুপম রূপরাশি পৃথিবীর আর কোথাও খুঁজে পাওয়া যাবে না। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে পৃথিবীর উষ্ণতা বেড়েই চলছে। প্রকৃতি হারাতে বসেছে তার রূপ-লাবণ্য। বাংলাদেশেও এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। বনভূমি ধ্বংস করে কলকারখানা তৈরি, অপরিকল্পিত  নগরায়ন, জমিতে অতিরিক্ত কীটনাশকের ব্যবহার বাংলাদেশে এক গুমোট আবহাওয়া তৈরি করছে। জীববৈচিত্র্য  টিকে রাখার জন্য যা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। চক্রাকারে  ঋতুর আবর্তন  আর তেমন চোখেই পড়ে না। আমাদের নতুন প্রজন্ম এমন সৌন্দর্য  উপভোগ করতে পারবে কি না শুধু পুস্তকে সীমাবদ্ধ ষড়ঋতুর বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে  জানবে এ নিয়ে শঙ্কা থেকেই যায়। তাই আমাদের  সকলকে নিজ নিজ জায়গা থেকে সচেতন হতে হবে। অধিকহারে বৃক্ষরোপণ  করতে হবে তবেই প্রকৃতি পাবে ফিরে তার আপন অস্তিত্ব।

মারিয়া জান্নাত মিষ্টি,
সমাজবিজ্ঞান বিভাগ
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।

করোনা পরাজিত যুবরাজ
                                  


লুৎপেয়ারা ফেরদৌসী

রোজ শুক্রবার,
২১ শে সেপ্টেম্বর, ১৯৯৪ সন
এক হতভাগী মায়ের কোল আলোকিত করে,
এসেছিলে এ ধরায়,
অচেনা পাথরগুলো ছড়াচ্ছিল লাবন্য প্রভা
পুষ্প খুলে দিচ্ছিল তার প্রতিটি  স্তবক,
উৎসারিত ঝর্ণা ধারায় প্লাবিত হচ্ছিল
সকলের মন।
এসেছিলে বলেই,
বর্ণিল স্বপ্নে স্পন্দিত হচ্ছিল প্রজাপতির ডানা,
কারুময় সবুজে ঘেরা নিবাস,
বাড়ির আংগিনা, বন্ধ জানালাগুলো
আলোয় ভরেছিল কানায় কানায়।।
পদবীতে তুই ছিলে,
ময়মনসিংহ শিক্ষা বোর্ডের এসিস্ট্যান্ট প্রোগ্রামার,
সততা, নিষ্টা ও মুগ্ধতার মূর্ত প্রতীক
কর্মদক্ষতায় সেরা বনে গিয়েছিলে,
বোর্ড পাড়ায় তোর জুড়ি মেলা ছিল ভার।।
শিক্ষা-দীক্ষায়, রূপে গুণে ও দূরদর্শিতায়
ন্যায় এবং সততার এক যুবরাজ,
স্বজন, বন্ধু বান্ধব আর সুশীল সমাজ,
ভালবাসার স্বর্গরাজ্যে বসিয়ে একগুচ্ছ পুষ্পের মত,
কবে যে পরিল তোকে স্বর্ণ খচিত হীরক তাজ।।
হঠাৎ, ঘোর অন্ধকার, নিঃস্তব্ধতা ও সীমাহীন নীরব,
পৃথিবীর সব আলো হয়ে গেল বিবর্ণ,
ফ্যাড জিন্সের মত মুছে গেল রংধনুর সাত রং,
কৃষ্ণাভ পালকের মতো লাইট পোস্টের নীথর আলো
চারদিকে নেই কোন সরব,
কারণ,
রোজ শুক্রবার ২রা জুলাই-২০২১ সন,
করোনায় কেড়ে নিল তোর জীবন।।
আহা!
তোকে কি আর ফিরে পাবনা?
আর কখনই কি ছোঁয়া যাবে না?
জাদু মাখা কন্ঠ, উচ্ছ্বসিত হাসির শব্ধ,
আর কি কখনোই হৃদয়ে ঝড় তুলবে না?
তুই হীনা আমি যে স্পন্দন হীন, প্রাণহীন, অতি নিঃস্ব।।
ফিরে আয়, ফিরে আয়, স্নেহের অনুজ,
বিউগুল সুরে বেজে চলেছে অবিরাম,
বুকের কাছাকাছি তোর স্নেহ পিয়াসী মুখ,
তুই ফিরে আয় নেয়ামুল।


সহকারী অধ্যাপক,
শাহ সুলতান(রঃ)ডিগ্রি মহাবিদ্যালয়,
মদনপুর, নেত্রকোনা

আত্মজা
                                  

লুৎপেয়ারা ফেরদৌসী

ভালবাসি ;
বড় বেশী আমার আত্মজাকে,
বক্ষপিঞ্জরে সযত্নে থাকা হৃৎপিন্ডটুকু
অনায়াসেই দিয়ে দিতে পারি
স্নেহ ভরা মায়া মুখ যার,
যে ভুলিয়ে দেয় আমার সমস্ত যাতনা।

সবকিছুকে গ্রাস করে তুমি
ভালবাসার পূর্ণতায়,
আমার হৃদয়ের পালংকে বসিয়া
আলোর ঝাড়বাতি হয়ে জ্বালিয়ে দাও,
জ্ঞানের চিরন্তন শিখা।

প্রাপ্তি;
থামিয়ে দিওনা তোমার চলার গতি,
তুমি হোঁচট খেয়ো না
বরং মোর ইচ্ছা পূরণে অগ্রগামী হয়ে,
অন্ধকারের দীপ হও
এ বসুন্ধরায়।

 

- সহকারী অধ্যাপক,
শাহ সুলতান  (রঃ)ডিগ্রি  মহাবিদ্যালয়,
মদনপুর , নেত্রকোনা

ছাত্র জীবনে নৈতিকতা ও মূল্যবোধ শিক্ষা প্রয়োজন
                                  

নাজমুন নাহার জেমি
নৈতিকতা হলো নীতি সম্পর্কিত বোধ, এটি একটি মানবিক গুণাবলি যা অন্য আরো অনেক গুণের সমন্বয়ে তৈরি হয়। মানুষ  পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র ও ধর্মের ওপর ভিত্তি করে সুনির্দিষ্ট কিছু নিয়মনীতি খুব সচেতনভাবে মেনে চলে। সমাজ বা রাষ্ট্র আরোপিত এই সব নিয়ম-নীতি ও আচরণবিধি মানুষের জীবন যাপনকে প্রভাবিত করে। এই নিয়মগুলো মেনে চলার প্রবণতা, মানসিকতা, নীতির চর্চাই হলো নৈতিকতা। আগে মানুষ বিশ্বাস করতো ধনের চেয়ে মন বড়। অথচ এখন এই ধারণা পাল্টে গেছে। প্রত্যেকে এখন অবিরাম ছুটে চলেছে অর্থ সম্পদ ও বিত্তের পেছনে। একজনকে পেছনে ফেলে আর একজনের সামনে এগিয়ে যাওয়ার প্রতিযোগিতা প্রত্যেককে করে ফেলেছে অন্ধ। প্রত্যেকে অবলীলায় বির্সজন দিচ্ছে নিজস্ব নৈতিকতা। তাই এখন সমাজের নিম্নস্তর থেকে উচ্চস্তর পর্যন্ত সবটাই ডুবে গেছে দুর্নীতি, অপকর্ম আর অনৈতিক কর্মকান্ডে।

নৈতিকতা ও মূল্যবোধকে মানুষ এমন করে নির্বাসিত করেছে যে, বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রীয় প্রধানরাও হরহামেশাই জেলে যাচ্ছে দুর্নীতির দায়ে। সামাজিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থার প্রত্যেকটি ক্ষেত্রই আজ নীতিহীনতায় জর্জরিত। মূল্যবোধের চর্চাকে এখন বোকাদের কাজ বলে বিদ্রুপ করা হয়। আমাদের দেশের যুব সমাজের দিকে তাকালে এই অবক্ষয়ের এক করুণ ও প্রত্যক্ষ চিত্র আমরা দেখতে পাই। লক্ষ লক্ষ তরুণ-তরুণী, কিশোর-কিশোরী এই অবক্ষয়ের কারণে নিজেদেরকে ঠেলে দিচ্ছে অন্ধকারের পথে, আসক্ত হচ্ছে মাদকে। ছিনতাই, অপহরণ, গুম, খুন, হানাহানি, নষ্ট রাজনীতি আর সন্ত্রাসের প্রতি জড়িয়ে যাচ্ছে। উজ্জ্বল ভবিষ্যতকে গলা টিপে হত্যা করে মূল্যবোধ আর নৈতিকতাকে বিসর্জন দিয়ে সব বয়সী মানুষ আজ চলেছে ধ্বংসের পথে। যে ছেলেটির হওয়ার কথা শিক্ষক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী বা প্রশাসক সে আজ হয়ে যাচ্ছে চোরাচালানকারী, মাদক ব্যবসায়ী কিংবা সন্ত্রাসী। যার দেশকে অনেক দূর এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার কথা ছিল সে আজ অন্যায় করে ব্যাহত করছে দেশের অগ্রযাত্রা। চলমান এই অবক্ষয় থামাতে হলে সবার আগে প্রয়োজন নৈতিক শিক্ষা ও মূল্যবোধের চর্চা। যে ব্যক্তির মধ্যে নৈতিক শিক্ষা থাকে, মূল্যবোধের প্রতি শ্রদ্ধা থাকে সে ব্যক্তি সকল অপরাধ থেকে বিরত থাকে।

শুধুমাত্র অবক্ষয় রোধের জন্যই নয় বরং জীবনকে সুন্দর করে তোলার জন্য ছাত্র জীবনেই নৈতিক শিক্ষার প্রয়োজন। নৈতিক শিক্ষায় শিক্ষিত ব্যক্তি তার নীতিতে অটল থাকে। মূল্যবোধ ব্যক্তি পর্যায়ে যেমন একজন মানুষকে সঠিক ও শুদ্ধ মানুষ রূপে গড়ে তোলে তেমনি রাষ্ট্রীয় পর্যায়েও মানুষকে সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তোলে। নৈতিক শিক্ষা ও মূল্যবোধ থাকার কারণেই মানুষ তার নিজের, পরিবারের, সমাজের ও রাষ্ট্রের প্রতি সকল দায়িত্ব কর্তব্য পালন করে। ছাত্র সমাজকে নৈতিক শিক্ষায় শিক্ষিত হতে হবে এবং নৈতিক শিক্ষার যথাযথ ব্যবহার করতে হবে। আমাদের বিদ্যমান শিক্ষা ব্যবস্থায় এবং ধর্মীয় শিক্ষা ব্যবস্থায় পাঠ্যসূচিতে নৈতিকতা ও মূল্যবোধ শিক্ষার উপযোগী বিষয়বস্তু থাকতে হবে। যে জাতি যতো বেশি নৈতিক শিক্ষায় শিক্ষিত এবং নিজস্ব মূল্যবোধের প্রতি শ্রদ্ধাশীল সে জাতি ততো বেশি সুসংহত। সব দিক দিয়েই বাংলাদেশ এগিয়ে চলেছে। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার হার বাড়ছে দিন দিন। কিন্তু শিক্ষিত মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সাথে সমাজে বাড়ছে মূল্যবোধের অবক্ষয়। খুন, গুম, ধর্ষণ, মাদকাসক্তি, দুর্নীতি ও অশ্লীলতার মতো অপরাধপ্রবণতাও দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। অশিক্ষিত লোকের পাশাপাশি শিক্ষিত লোকেরাও এসব অপরাধের সাথে সম্পৃক্ত।

শুধু কাগজে-কলমে শিক্ষিত লোকেদের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে বলে শিক্ষিত লোকেরা এ সমাজকে গ্রাস করে ফেলছে। অনৈতিকতা ও মূল্যবোধের অবক্ষয়ের ফলে সমাজ ও রাষ্ট্রকঠামোতে আজ অস্থিরতা বিরাজ করছে। এই নেতিবাচক প্রভাবকে প্রভাবিত করতে হবে ইতিবাচক নৈতিকতা ও মূল্যবোধ দিয়ে। সামাজিক কৃষ্টি-কালচার, আচার-আচরণ, রীতিনীতিও শিক্ষার্থীদের মূল্যবোধ সৃষ্টিতে প্রভাব ফেলে। সারা জীবনের জন্য পরিকল্পনা করতে চাইলে মানুষের জন্য সুশিক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে। এখানে সুশিক্ষা বলতে নৈতিকতা ও মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন শিক্ষার কথা বলা হচ্ছে। নৈতিক শিক্ষা ও মানবিক শিক্ষার মিলনস্থল হলো সুশিক্ষা। সুশিক্ষা একজন শিক্ষার্থীর নৈতিক মানদন্ডকে উন্নত করার পাশাপাশি তার ভিতরকার মানবিক মূল্যবোধকে জাগ্রত করে। ক্লাসের শিক্ষা শিক্ষার্থীদের সুপ্ত প্রতিভার বিকাশ ও সৃজনশীল চিন্তার প্রসার ঘটাতে পারে এই দিকটি শিক্ষক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং অভিভাবকের নজরে থাকতে হবে।

মূল্যবোধ সৃষ্টির লক্ষ্যে দেশের প্রাথমিক থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত শিক্ষার সকল স্তরে নিজ দেশের কৃষ্টি কালচার বিষয়ক নানা রকম অনুষ্ঠানমালার আয়োজন করা যেতে পারে। এতে শিক্ষার্থীরা নৈতিকতা ও মূল্যবোধ সম্পর্কে অনেক সচেতন ও সজাগ হবে।  বিশ্বের দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে হলে প্রয়োজন নৈতিক চরিত্র বলে বলীয়ান, মানবিক গুণাবলীসম্পন্ন মানবসম্পদের। এসব কারণেই নৈতিকতা ও মূল্যবোধ শিক্ষা বৃদ্ধিতে মনোযোগী হতে হবে।

লেখিকা-
নাজমুন নাহার জেমি
শিক্ষার্থী, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।

বঙ্গমাতা ফজিলাতুন্নেছা মুজিব
                                  

ড. খান আসাদুজ্জামান

হে বঙ্গমাতা ফজিলাতুন্নেছা মুজিব
বঙ্গবন্ধুর অন্তহীন প্রেরণার আধার
তুমি বুঝেছিলে তোমার জীবন সঙ্গীর
বিপ্লবী চেতনার প্রচ্ছন্ন ইঙ্গিত।

তাই বুঝি হাতে হাত রেখে
মুজিবকে তুলে দিয়েছিলে
হেমিলনের সেই বাঁশের বাঁশি
আর বিপ্লবের অনির্বান অগ্নিশিখা।

বাঙালির প্রাণ প্রিয় দেবতা
তোমার মূল্য দিয়েছে,
তোমার সে অর্ঘের
জনতাও দিয়েছে তাই অমোঘ নৈবেদ্য
বঙ্গবন্ধু উপাধিতে ভূষিত করেছে
কাল হতে মহাকালে।

রাজনীতি আর সংসারের
অপরিহার্য দায় ছিল তোমার
তাই তো তুমি সংসার সন্তান আর
রাজনীতির নিষ্ঠুর ঘুর্ণাবর্তে
হারাওনি তোমার সাহস।
তুমি অন্তহীন প্রেরণা যুগিয়েছো
বঙ্গবন্ধুর কারা প্রকষ্ঠের গরাদ ছুঁয়েছুঁয়ে।

হে বঙ্গজননী, তুমি তাঁর সতীর্থ ভাবনার
ছিলে নিরবিচ্ছিন্ন আর অদম্য সহচারী
তুমি পায়ের তলার মাটি হারাওনি কখনো
কোন শ্যেন-শকুনের নখের থাবায়।

তুমি সাহস যুগিয়েছো ঘরে বাইরে
তোমার দোসর হাতের পেলব ছোঁয়ায়
তাইতো তিনি বঙ্গবন্ধু হতে পেরেছিলেন
নিঃশঙ্ক বিপ্লবী অভিযানে।


শত ঝড় ঝাপটা প্রতিকুলতায়
তোমার অসামান্য অবদানে
বঙ্গবন্ধুর বিপ্লবী চেতনা হয়েছিল খুরধার
তুমিশুধু বঙ্গবন্ধুর অপ্রিয়ঙ্গী-ই নও
তুমি ছিলে গণমানুষের উৎসাহের
এক বিশ্বস্ত সূতিকাগার।

বঙ্গভূমির মানুষ অকৃতজ্ঞ নয়
বঙ্গবন্ধুর নামের পাশে
তুমিও তাই বঙ্গমাতা হলে
সর্বংসহা এক আত্মত্যাগীর
নামের পাশে উচ্চারিত হবে
তোমার নাম, অবিরাম।

তুমি বঙ্গমাতা ফজিলাতুন্নেছা মুজিব
নিজের ভোগবিলাসকে জলাঞ্জলি দিয়ে
তুমি নিবেদিত ছিলে বিপ্লবী কোনো
সাত মার্চেও মহাকাব্যের
অমর কবির সহধর্মিনী হয়ে।

বঙ্গমাতা ফজিলাতুন্নেছা মুজিব
তুমি অনন্যা, অসাধারণ
তোমার স্বপ্নের এ বঙ্গে
আমরাও আছি-
ছিলাম তোমার সঙ্গে ॥

এবার করোনায় আক্রান্ত তসলিমা নাসরিন
                                  

স্বাধীন বাংলা অনলাইন :
এবার মহামারী করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন বাংলাদেশের বিতর্কিত ও নির্বাসিত লেখিকা ভারতে অবস্থানরত তসলিমা নাসরিন। রোববার (৯ মে) তিনি তার ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে বিষয়টি জানিয়ে স্ট্যাটাস দিয়েছেন।

স্ট্যাটাসে তিনি লিখেছেন, ‘আমি চিরকালই বড় দুর্ভাগা। এই যে গত বছরের মার্চ মাস থেকে  একা আছি ঘরে, একখানা ইন্ডোর ক্যাট সঙ্গী, কোথাও এক পা বেরোলাম না, কাউকে ঘরে ঢুকতে দিলাম না, রান্না বান্না বাসন মাজা কাপড় কাচা ঝাড়ু মোছা সব একাই করলাম, কী লাভ হলো? কিছুই না। ঠিকই কোভিড হলো। গত এক বছরে শুধু একবার এক ঘণ্টার জন্য বাইরে বেরিয়েছিলাম, তাও দু’মাস আগে, টিকার প্রথম ডোজ নিতে। ওই ডোজটি কিছু অ্যান্টিবডি তৈরি করেছিল বলে হয়তো এ যাত্রা বেঁচে গেছি।  

আমি চিরকালই বড় দুর্ভাগা। এক এক করে যদি লিখি কী কী ঘটেছে জীবনে যা ঘটার কথা ছিল না, তাহলে তালিকা এত দীর্ঘ হবে যে পড়ে কেউ কূল পাবে না। আপাতত কোভিড হওয়ার দুঃখটাই থাক। দুঃখ থাকাও হয়তো ঠিক নয়। কারণ ধীরে ধীরে আমি সুস্থ হয়ে উঠছি। কিন্তু হাজারো মানুষ যারা সুস্থ হতে পারেনি! যারা শ্বাস নিতে আপ্রাণ চেষ্টা করেছে কিন্তু পারেনি শ্বাস নিতে! দুঃখগুলো বরং তাদের জন্য থাক। এখন এইটুকু অন্তত ভালো লাগছে, এটি আর স্টিগমা নয় আগের মতো। কারো কোভিড হলে সে লুকিয়ে রাখতো খবর, কারণ কোভিড হওয়াটা অনেকটা ছিল এইডস হওয়ার মতো। সমাজ ব্রাত্য করে দিত। এক বছরে এত মানুষকে ধরেছে এই কোভিড, এতে, ভালো, যে, স্টিগমাটা গেছে। কেউ আর বলতে দ্বিধা করেনা যে তার কোভিড হয়েছে।’

পড়ালেখার উদ্দেশ্য কি চাকুরী জোগাড় মাত্র?
                                  

পত্রিকার খবরে চোখ বুলুতেই দেখলাম বেশ বড় করে হেডলাইন ছাঁপা হয়েছে- রাবি শিক্ষার্থীর আত্মহত্যা। পুরো ঘটনা শেষ করে বুঝতে পারলাম রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাব বিজ্ঞানের মনিরুল ইসলাম নামের এক শিক্ষার্থীর গত জানুয়ারিতে সরকারি চাকুরির বয়স শেষ হয়ে যায়। এরপর থেকেই প্রচন্ড হতাশায় ভুগতিছিলেন তিনি।  অতঃপর সেই দীর্ঘকায় হতাশা থেকেই আত্মহত্যা।

শিক্ষাকে বলা হয় মানবজীবনের এক অমূল্য সম্পদ। কেননা, সামগ্রিকভাবে একজন মানুষের বিকশিত হতে যেসব অপরিহার্য উপকরণ প্রয়োজন, তন্মধ্যে শিক্ষার স্থান সর্বাগ্রে। শিক্ষা মানুষের অন্তর্নিহিত সুপ্ত প্রতিভাকে উন্মোচিত করে আনার এক অনিবার্য উপায়। দার্শনিক কান্ট বলেছেন- আদর্শ মনুষ্যত্ব অজর্নই শিক্ষা। হাবার্ট রিড বলেছেন- মানুষকে মানুষ করাই হল শিক্ষ। বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া পঞ্চাশ জনেরও অধিক শিক্ষার্থীকে আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম- এই যে দীর্ঘ এক যুগেরও বেশি সময় ধরে আপনি বই এর পাতা চুকালেন তাতে আপনার ও আপনার জাতির মধ্যে আশা-আকাঙ্ক্ষার কতটুকু প্রতিফলন ঘটল, কি আপনার প্রাপ্তি , কেনই বা করছেন পড়ালেখা?  দুঃখজনক হলেও সত্য- কেউ ভবিষ্যৎ এ ভালো থাকতে চায়, কেউ বিসিএস ক্যাডার হতে চায়, কেউ নামিদামি একটি চাকুরী করে সমাজে লোকের কাছে সম্মান পেতে চায়। অথচ একজনও আমাকে বলল না, আমি মানুষের মতো মানুষ হতে চাই, সুনাগরিক হতে চাই। তাহলে আমরা দীর্ঘ এক যুগেরও বেশি সময় ধরে নামিদামি কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শিক্ষাপাঠ চুকিয়ে গ্রাজুয়েট হয়ে কি এমন শিক্ষা অর্জন করছি যা আমাদের ভালো রেজাল্ট কিংবা সরকারি চাকুরীর পিছনে ছুঁটতে বাধ্য করে?

আজ আমাদের শিক্ষা অর্জন শুধুমাত্র ভালো রেজাল্ট কিংবা চাকুরী ভিত্তিক হয়ে গেছে। হবেই বা না কেন? আমাদের সমাজ ও শিক্ষাব্যবস্থা আমাদের শিক্ষাকে ভালো রেজাল্ট ও চাকুরীভিত্তিক করে দিয়েছে। আমাদের সমাজ ও শিক্ষাব্যবস্থা আজ তাকেই মূল্যায়ন করে যে শিক্ষার্থী পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পায় কিংবা যে একটি ভাল চাকুরী করে। যে শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ কিংবা ভাল একটি চাকুরী পায় না তাকে আমরা কখনো মূল্যায়ন করতে চাই না। তার ভীতরের অন্তর্নিহিত সুপ্ত প্রতিভা বিকাশের সুযোগ দিতে চাই না। তাই একজন শিক্ষার্থী মনেপ্রাণে ধারণ ও লালন করে আমি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ ও একটি ভাল চাকুরীর জন্যই পড়ালেখা করছি।

আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা যে এখনো সৃজনশীলতার আঁড়ালে গৎবাধা মুখস্থভিত্তিক বা পুস্তকভিত্তিক তাত্ত্বিক শিক্ষাপদ্ধতি রয়ে গেছে তার একটি উৎকৃষ্ট উদাহরণ হলো- মাধ্যমিক পর্যায়ে যখন একটি শিক্ষার্থীকে ‘তোমার জীবনের লক্ষ কি’? রচনা লিখতে বলা হয়; তখন যথারীতি পরীক্ষার খাতায় সবাই পুস্তকের পাতার সেই  বাণীগুলো লিখে যে- কেউ ডাক্তার হতে চায়, কেউ ইঞ্জিনিয়ার হতে চায়, কেউ পুলিশ হতে চায়, কেউ শিক্ষক হতে চায় এবং কেউ পাইলট হতে চায়। কিন্তু বাস্তবে কতজন ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, পুলিশ, শিক্ষক বা পাইলট হতে পারছে ? এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়, যেটি নিত্য নতুন জ্ঞান অর্জন ও গবেষণা দ্বারা নতুনত্ব উদ্ভাবনীর একটি প্লাটফর্ম সেখানেও যুগের পর যুগ ধরে ভাল সিজিপিএ’র টানে ও ভাল একটি চাকুরীর আশায় আমরা পুস্তকের পাতা মুখস্থ করে চলছি। এটা কি সৃজনশীলতার ধ্বংসস্তূপ নয় মাত্র?

ইউজিসির ওয়েবসাইট অনুযায়ী- বর্তমানে দেশে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ৪৬ টি, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ১০৬ এবং আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয় ০৩ টি। সরকারি পর্যায়ে মেডিকেল কলেজ ৩০ টি, বেসরকারি পর্যায়ে আছে ৬৫ টি। এই পরিসংখ্যান থেকে খুব সহজেই শিক্ষাক্ষেত্রের দৃশ্যমান অগ্রগতি সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। কিন্তু শিক্ষাক্ষেত্রের এই অগ্রগতি কি আদৌ সুনাগরিকতা এবং দক্ষতাসম্পন্ন জনশক্তির আওতাভুক্ত হচ্ছে? শিক্ষাব্যবস্থার ভালো রেজাল্ট কি আদৌ তাদের কর্মসংস্থান দিতে পারছে? শিক্ষাব্যবস্থার এই দৃঢ়মান অগ্রগতি দিয়ে আজ কি হবে; যেখানে নৈতিক ও মূল্যবোধের শিক্ষা না পেয়ে বড় বড় নামকরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে একজন শিক্ষার্থী গ্রাজুয়েট চুকিয়ে কর্মজীবনে আকাশচুম্বী দুর্নীতিতে লিপ্ত থাকে। পৃথিবীতে যত সুশৃঙ্খল ও উন্নত জাতি রয়েছে তারা শিক্ষার মাধ্যমেই এতদূর এসেছে। কিন্তু যে শিক্ষা সুশিক্ষা, মনুষ্যত্ব, নিষ্ঠা,  মানুষের মতো মানুষ হওয়া ও সুনাগরিকতার শিক্ষা না দিয়ে জিপিএ-৫ ও চাকুরীভিত্তিক শিক্ষা দিচ্ছে, কাগজেকলমে সে শিক্ষার কি দরকার?

আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার লক্ষ যদি হয় একজন সুনাগরিক তৈরি করা, একজন সুশিক্ষিত মানুষ গড়ে তোলা তবে এ সমাজ ও অভিভাবকবৃন্দ জানবে তাদের সন্তান জিপিএ-৫ কিংবা চাকুরীর জন্য নয় বরং মানুষের মতো মানুষ ও সুনাগরিক হিসেবে গড়ে উঠার জন্য শিক্ষা গ্রহণ করছে। একজন শিক্ষক জানবে, সে ছাত্রদের সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার নৈতিক দায়িত্ব পালন করছে। আমাদের জাতীয় লক্ষ হতে হবে- তথাকথিত শিক্ষিত গড়ে না তুলে রাষ্ট্র পরিচালনায় দক্ষতাসম্পন্ন জনবল তৈরি করা। শিক্ষার মানদন্ড- জিপিএ-৫, ভালো সিজিপিএ কিংবা চাকুরী নয় বরং সততা, নিষ্ঠা, আদর্শ, ন্যায়পরায়ণ ও দেশপ্রেমের সমন্বয়ে শিক্ষার্থীদের দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তর এবং সুনাগরিকতার শিক্ষায় তাদের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে জাতীয় উন্নয়ন হোক এদেশের শিক্ষাব্যবস্থার  প্রধান লক্ষ-উদ্দেশ্য । দেশের স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়কে এই জাতীয় লক্ষ-উদ্দেশ্য হাসিলের প্রশিক্ষণকেন্দ্র রূপে গড়ে তুলতে হবে। তবেই এদেশ থেকে তথাকথিত শিক্ষিত’র বিলুপ্তি ঘটে দক্ষতা ও মনুষ্যত্ববোধ সম্পন্ন মানুষ তৈরিসহ দেশের টেকসই উন্নতি ও আত্মমর্যাদার সাথে  বিশ্বের দরবারে আমাদের মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে শিখাবে।

লেখক- মোহম্মদ শাহিন
শিক্ষার্থী, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

গল্পের মধ্যে গল্প
                                  

মোমেনা আক্তার

পাশাপাশি বেঞ্চে আমরা, আমি আর সুভা। সুভা খুব ভালো বন্ধু হলেও আমার খুব হিংসে হতো, কারণ ক্লাসে নম্বর পাওয়াতে সে ছিল একমাত্র আমার প্রতিদ্বন্দ্বী। এক-দু নম্বর কম পেলেই কান্না শুরু করে দিতো। আমি অবশ্য কান্না করতাম না, মনে মনে জেদ চাপতাম পরেরবার আরও বেশি পেতে হবে। এমনি ছিলো আমাদের ছোটবেলার দিনগুলো। পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত কেজি স্কুলে পড়ে আমি ভর্তি হই হাই স্কুলে আর ও ভর্তি হয় গার্লস স্কুলে। স্কুলের মধ্যে দুরত্ববেশি না হলেও সেই আগের মতো আর দেখা হয় না। অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময় প্রায় ৩ বছর পর হঠাৎ ওর সাথে দেখা, একই স্যারের কাছে গণিত প্রাইভেট পড়তাম। বললাম,‘ওমা! সুভা নাকি? তোমাকে তো চেনাই যাচ্ছে না, বড় হয়ে গেছো!’

মনে হয়, আমার কথাতে বেশ লজ্জা পেয়েছে। কোনো জবাব না দিয়ে একটা মুচকি হাসি দিয়ে চলে গেল। পরদিন আবার দেখা, এখন কিছু না বলে আড় চোখে স্যারকে ফাঁকি দিয়ে ওকে দেখতাম। সুভা বেশ মনোযোগ দিয়ে অংক বুঝে নিচ্ছে চোখ পড়তেই আমি স্যারের দিকে তাকাই আর ভাবি, যে মানুষ ক্লাসে কথায় খই ফুটাতো, আজ এত নিশ্চুপ। এই সুভাকে এতদিন ভুলে গিয়েছিলাম! প্রাইভেট শেষে ও ডাকলো, ‘শুনেন, কেমন আছেন?’ নিচু গলায় বলে।

-সুভা, তোমার সাথে তো গতকাল কথা বলতে চেয়েছিলাম, কথা বললে না।
-না, আমি এমনিতেই ছেলেদের সাথে কম কথা বলি, হঠাৎ করে দেখছি তো চমকে গিয়েছিলাম।

ওমা! এ কেমন কথা! ৫ বছর একসাথে থাকলাম, আরও কত কথা কাটাকাটি হয়েছে, হয়েছে রাগ অভিমান। তুমি ছেড়ে তুই বলেছি আমরা। আর এখন ও বলে আপনি! আমি এত অচেনা হয়ে গেলাম? নাহ্, আমি ঠিক আছি, সুভা একদম পরিবর্তন হয়ে গেছে। সেদিন বেশি কিছু বলা হয় নি, তাড়া দেখিয়ে চলে যায় ও। সে যাক গে, আমি এত ওকে নিয়ে ভাবছি কেন! ও থাকুক ওর মতো। প্রাইভেটে একটু একটু করে কথা হয় আমাদের। কয়েকদিন পর অনেকবার বলে আপনি থেকে তুমিতে নেমেছে। পড়াশোনার তেজ আগের মতোই আছে কিন্তু বান্ধবী আর ছেলের মধ্যে আমি ছাড়া আর কারও সাথে কথা বলতে দেখি না। যাক, এটাও ভালো।

আজকালের ছেলেমেয়েরা যে দুষ্টু, কোনো ফাঁদে না পড়ার জন্যে এমন থাকাই ভালো। আমিও দরকার না হলে কথা বলি না, কিন্তু ও আর পিছিয়ে গেলো না। আমাদের বন্ধুত্ব আরও গাঢ় হতে লাগলো। অষ্টম শ্রেণিতে বৃত্তি পরীক্ষায় সুভা ট্যালেন্টপুল আর আমি সাধারণ গ্রেডে বৃত্তি পাই। ওর প্রতি হিংসাটা যেমন বাড়লো, ভালো লাগাটাও কম ছিলো না। নবম শ্রেণিতে ওকে আমাদের স্কুলে ভর্তি হতে বলি, কিন্তু ওর আর ওখানে থাকা হলো না। ওর বড় ভাই ঢাকায় থাকে, ওকে ঢাকায় ভর্তি করে দিবে। শুনে খুবই খারাপ লাগে, কি যেন হারিয়ে ফেললাম! কিছু করার নেই। ঠেকাতে পারবো না তো।

আবার ৭ বছর পর দেখা সুভার সাথে! এবার সুভাই আমাকে চিনে ফেলেছে, ‘মাহমুদ তুমি এখানে! কবে আসছো? অনেকদিন পর দেখা।’ এবার আবাক হই আরও বেশি। ওর মধ্যে অকল্পনীয় পরিবর্তন, কথা বলছিলাম না দেখে আবার বললো, ‘মাহমুদ, আমাকে চিনছো? আমি সুভা।’

-ওহ্, সুভা! আমি তো আনেক আগে এসেছি, এখানেই পড়ি। হিস্টোরি থার্ড ইয়ার। তোমার খবর কী, বলো? তুমি এখানে!
তুমি ঢাবিতে পড়! আমিও তো, বিবিএ ফিন্যান্স থার্ড ইয়ার। আমার ভাই থাকে মোহম্মদপুরে ওখানেই থাকি। বাহ্, আমরা একই ইউনিভার্সিটিতে পড়ি, তাও কতদিন পর দেখা!

টিএসসিতে বসে চা খেতে খেতে আরও কিছুক্ষণ গল্প করলাম। আমি যতই ওকে দেখি, ততই মুগ্ধ হই। এক সুভার এত বৈচিত্র্য! সময় আর পরিবেশ মানুষকে কী না করতে পারে? মাঝে মাঝে ক্যাম্পাসে দেখা হয়ে যায়। সময় মিললে কখনও বা ওকে নিয়ে ঘুরতে যাই শহীদ মিনার বা পুরান ঢাকার ওদিকে। পুরান ঢাকার বিরিয়ানি খাওয়াতো সে, আর গল্প করতো, নানান রং-বেরং এর গল্প, তার গল্পের চেয়ে গল্প বলার ধরণ ছিলো খুবই আকর্ষণীয়। যে কেউকে মুগ্ধ করতো। গান গাইতো, আবৃত্তি, অভিনয়, উপস্থাপনা; এতকিছু সে কবে শিখলো!

সাবেক রুমমেট বড় ভাই ফরেন ক্যাডার হলেন। উনার মতো ক্যাডার হতেই হবে। উনার অনেক কষ্টের গল্প শুনেছি। পড়া ছাড়া কিছু বুঝেন না। আজ থেকে উনার মতো করে এগোবো আর সুভাকে ভালোবাসার কথাটা বলে ফেলবো। আমি জানি, ও আমাকে পছন্দ করে, তা না হলে এত ছেলে বাদ দিয়ে আমাকে এত সময় দিবে কেন! তাছাড়া ও আমাকে ছোটবেলা থেকেই চিনে। নিশ্চয় আমাকে নিয়ে ভাবে। ওকে নিয়ে আমার অন্যরকম অনুভূতি হয়।

ফরেন ক্যাডার ভাই এর বিয়ে ঠিক হলো। হ্যাঁ, আমিও ওমন ক্যাডার হয়ে সুভাকে বিয়ে করে ফেলবো। ভাবতে ভাবতেই সুভার ফোন কল, ‘কী করো? একটা সুখবর আছে।’

-কী সুখবর? শুনো,আজ বিকেলে ক্যাম্পাসে আসো কথা আছে।
-না, আজ পারবো না। শুনো, পরশু দিন আমার বিয়ে কেনা-কাটা, ঝায়-ঝামেলা আছে অনেক, তোমাকে আসতে হবে কালকে। ছেলে ফরেন ক্যাডার, ঢাবির স্টুডেন্ট, বিবিএ, এমবিএ করেছে। ভাই সময় নিচ্ছে না। তুমি কাল সকাল ৯ টায় চলে আসো...।
মনের অজান্তে বলে ফেললাম, ‘আলহামদুলিল্লাহ। হ্যাঁ, যাবো।’

আমার রুমমেট ভাই এর বিয়ে যেতে তো হবেই। রুমের সবাইকে দাওয়াত দিয়ে গেলেন।
দেখি, এ জীবন আরও কতদূর যায়, চলুক জীবন জীবনের মতো।

লেখক : শিক্ষার্থী-শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট।

স্বাধীন বাংলা/এআর

গল্প : সুখ
                                  

পলি তালুকদার

মায়ের যখন ৩য় বিয়ে হয় তখন আমার বয়স ১৬ বছর। আমি আমার মাকে ছোট থেকেই খুব ভালবাসতাম, কিন্তু কেন জানি না মায়ের এই ৩য় বারের বিয়েটা আমি মেনে নিতে পারিনি। এই ৩য় বারের বিয়ের জন্য আমি মা কে খুব ঘৃণা করতাম। তবে সেটা মনে মনে, মুখে খুব কমই তার প্রতিফলন হতো। এই দুনিয়াতে মা আর রাসেদ ছাড়া আমার আর কোন আপন লোক নেই। যে লোকটার সাথে মা ৩য়,বার বিয়ে করেন তার নাম রাসেদ! কেন জানি না এই লোকটাকে আমার বাবা বলে ডাকতে ইচ্ছে করে না।

আমি যখন মায়ের পেটে তখন আমার ১ম বাবা নাকি মারা যান! যদিও আমি সবটা ঠিকঠাক জানি না, কি করে বাবা মারা গেলেন। তবে লোকমুখে শুনেছি বাবা আর মা নাকি ভালবেসে বিয়ে করেছিল। পুরো ৫ বছর সম্পর্কের পর তারা গোপনে বিয়ে করেছিল, কারণটা ছিল বাবা বেকার আর দরিদ্র পরিবারের ছেলে তাই আমার নানা-নানী কেউ মায়ের সম্পর্কটা মেনে নিতে পারেন নি। মা নানার একমাত্র মেয়ে খুব আদরের ,তাদের আর্থিক অবস্থাও খুব ভাল। তাই মা আর বাবা পালিয়ে বিয়ে করে।

বিয়ের ঠিক ১ বছর পর আমি মায়ের গর্ভে আসি। শুনেছি মা যখন ৩ মাসের অন্তঃস্বত্তা, বাবা তখন কোন একটা কাজে আমাদের একা ফেলে চলে যায়, তারপর আর কখনো ফিরে আসেন নি। এর ঠিক ৫ মাস পর নাকি মায়ের কাছে খবর আসে যে বাবা বেঁচে নেই, যদিও মা বাবার মুখটাও শেষ বারের মতো দেখতে পায় নি। লোকমুখে শুনেছি খবরটা নাকি মিথ্যা ছিল। আমি কিংবা মা কথাটার সত্য মিথ্যা কতোটুকু আজও খুঁজে পাই নি, আর না তো বাবা কখনো আমাদের খোঁজ নিয়েছে।

আমার যখন ৩ বছর বয়স তখন মা ২য় বারের মতো বিয়ে করেন। যদিও এই বিয়েটা মা আমার জন্যই করেছিল। আমার ২য় বাবার নাম জাহেদ। উনি আমাকে খুব ভালবাসত। ছোট থেকে আমি ওনাকেই বাবা ডেকেছি। মা তাই আমার সুখের জন্য তাকে বিয়ে করে। আমার এই বাবাটা খুব ভাল ছিল, আমার আর আমার মায়ের খুব খেয়াল রাখত। মায়ের মুখে শুনেছি তিনি নাকি আমি মায়ের পেটে থাকা অবস্থায় মা কে অনেক সাহায্য করেছিল। মা খুব অল্প বয়সে বিয়ে করেছিল। মায়ের যখন ১ম বিয়ে হয়, তখন মায়ের বয়স ১৭ বছর। আমাকে নিয়ে মায়ের কাজ করতে খুব কষ্ট হতো! তবুও জীবন বাঁচাতে মা ছোট্ট একটা চাকরি নেয়, তাতে আমাদের সংসার কোনরকম এ চলে যেত!

আমি নাকি ছোট বেলায় আমার ২য় বাবা কে, বাবা বলে ডাকতাম। সবচেয়ে বেশি শান্ত আমি তার কোলেই থাকতাম। আমাদের ছোট্ট সংসারটা ভালই চলছিল। আমার যখন ৫ বছর বয়স তখন আমার ছোট্ট একটা ভাই আসে। আমি তার নাম রেখেছিলাম ইফতি। ইভার ভাই ইফতি। কিন্তু আমাদের এই ছোট্ট পরিবারে এত সুখ বিধাতার সহ্য হয়নি। ইফতির যখন ৩ মাস বয়স তখন সে টাইফয়েডে মারা যায়!

ইফতির মৃত্যুতে সবচেয়ে বেশি কষ্ট পেয়েছিলাম আমি। আমার সেসব স্মৃতি খুব ভাল মনে নেই তবে ইফতির মুখটা আমার স্পষ্ট মনে আছে ওর সেই হাসিটা এখনো আমার চোখে ভাসে। ইফতিকে হারিয়ে পুরো পরিবারে শোকের ছায়া নেমে এলো। হাসিখুসি ভরা পরিবারটা যেন মুহূর্তে কালো মেঘে ঢেকে গেল! ইফতির মৃত্যুর ঠিক ২ মাস পরে আমার ২য় বাবা ও একটা রাস্তা দূর্ঘটনায় মারা যান। বাবার মৃত্যুতে আমি পুরো স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলাম। বাবার লাশটার সামনে এসে শুধু বাবাকে বলেছিলাম, ‘আমার আর চকলেট লাগবে না, তুমি ওঠো’ কিন্তু বাবা আর উঠল না। বাবা ও আমাদের ছেড়ে ইফতির কাছে চলে গিয়েছিল। বাবার মৃত্যুর পর বকবক করে পাগল করা এই আমিটা হয়ে যাই নিস্তব্ধ। সেই থেকে আমি চুপচাপ স্বভাবের হয়ে যাই!

এরপর আমাদের সংসারটা মায়ের বাসা বাড়িতে কাজের টাকা দিয়ে কোনরকমে চলে যায়! কখনো ৩ বেলা বা কখনো ২ বেলা খেয়ে দিন কাটাতাম। বাবার রেখে যাওয়া শেষ সম্বলটুকোও হারিয়ে ফেললাম আমার পড়াশোনার খরচ বহন করতে গিয়ে। শেষ পর্যন্ত আমার পড়াশোনা বন্ধ হবার উপক্রম। মা কে একবার বলেছিলাম নানাকে জানাতে। মা না করে দিয়েছিল, ২য় বার আমি আর মা কে এ ব্যাপারে কিছু জিঙ্গেস করিনি। আমি যখন উচ্চ মাধ্যমিকে উঠব তখন ভর্তির টাকাটাও ছিল না। মা কে বললাম থাক আর পড়াশোনা করব না। মা বলেছিল তোকে আমার মতো হতভাগী হতে দেব না, দরকার হলে কিডনি বিক্রি করব। তবে মা কে তা করতে হয় নি, রাসেদ সাহেব মা কে আমার ভর্তির টাকাটা দেন। তা দিয়েই আমি ভর্তি হই।

অনেক টাকার মালিক রাসেদ সাহেব কেন জানি না মাকে বিয়ের প্রস্তাব দেয়। রাসেদ সাহেবের কোন সন্তান নেই, স্ত্রী গত হয়েছেন ৩ বছর হলো। মা আমাকে এসে বলল, ‘রাসেদ সাহেব আমাকে বিয়ে করতে চায়, তোকেও মেয়ে বলে মেনে নেবে, কি করব?’ কথাটা বলতে গিয়ে মায়ের মুখটা লজ্জায় নিঁচু হয়ে গেল। আমি দেখলাম মায়ের, দু’গাল বেয়ে অঝরে পানি পড়ছে। আমি বললাম, ‘বিয়েটা করো’। মা আমার দিকে একবার তাকিয়ে দৌড়ে ঘরে গিয়ে দরজা দিয়ে দিল। আমি বাইরে থেকে মায়ের কান্নার আওয়াজ পেলাম। আকাশের দিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে নিজের কাজে চলে গেলাম।

৩য় বার বিয়ের পর আমি মাকে কখনো আমার সামনে মাথা উঁচু করে কথা বলতে দেখিনি। যদিও রাসেদ সাহেব আমাকে যথেষ্ট ভালবাসেন তবুও লোকটাকে বাবা বলে মেনে নিতে পারি নি। আমি যখন ঘুমিয়ে থাকি তখন মা আমার পায়ের কাছে এসে রোজ রাতে কাঁদে! আমি টের পাই কিন্তু কিছু বলিনা। আমি জানি মা এই বিয়েটা করেছে আমাকে ভাল রাখতে তবুও, না আমি আর না তো মা সুখে আছি। আমরা হয়তো ভাল আছি তবে সুখে নেই। রোজ রাতে আমি আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকি আর ভাবি, ‘সুখটা কি জিনিস? কোথায় থাকে? সবার জন্য কি সুখটা নয়?’ উত্তর মেলে না। এক বুক দীর্ঘশ্বাস নিয়ে আবার চলে আসি একটু সুখের আশায়!

স্বাধীন বাংলা/এআর

আজ আমার রাতের খাবার নেই
                                  

ধ্রুব খান 

আমি আসলে মাঝে মাঝে বুঝে উঠতে পারিনা। তারা কি আসলেই আমার কথা বোঝে নাকি যা হয় তা একটি ভ্রম অথবা আমার মনের সাথে মিলে যায়। আমি যখন মনে মনে ভাবি মা টা এখন সাবান এর উপর বসবে তখন কিভাবে যেনো আসলেই সাবানের উপর বসে। আবার যখন ভাবি বাচ্চাটা এখন আমার নখের কাছে আসবে। আসলেই এসে পরে। এর কারণ কি! টেলিপ্যাথি নাকি। ওদের তো নিজেস্ব কোনো ভাষা নেই। নিশ্চয়ই তারা নিজেরা টেলিপ্যাথির মাধ্যমে কথা বলে। আচ্ছা আমার মাথায় এখন যা ঘুরছে তা কি তারা বুঝতে পারছে! বাবাটা কেমন তাজ্জ্বব হয়ে তাকিয়ে আছে। তারা কি বুঝে ফেলেছে আমি একটা খুন করতে চাই। খুব সুন্দর একটা খুন। সেই খুনেও যেনো সৌন্দর্য ফুটে উঠে। তারা কি আমাকে পিশাচ মনে করছে!

বাথরুম থেকে বের হয়ে দেখলাম আনিশা দাঁড়িয়ে আছে। হাতে প্লেট। প্লেটে দুটো পোড়া পরটা। সাথে একটু ভাজি যার দুটো আলু প্রায় সাদা হয়ে গেছে।
- মুগ্ধ ভাইয়া দয়া করে রুম টা একটু গুছিয়ে রাখবেন।
- কেনো রে, এই রুমে কি তোর বাসর হবে?
- বাজে কথা বলবেন না।
- রসিকতা করলাম। ছাদের চিলেকোঠায় কেনো কারো বাসর হবে।
- হলে হবে। আমার বাবার বাসা। আমি যদি খোলা ছাদে বাসর করতে চাই, কারো কোনো সমস্যা থাকার কথা না।

- খোলা ছাদে না হয় হাত ধরে হাটতে পারবি। বাসর চাইলে এই চিলেকোঠায় করতে পারিস।
- তার মানে, আপনি এই বাসা আগামী চার বছরেও ছাড়ছেন না। শুনেন মুগ্ধ ভাইয়া, আমারা একটি সাধারণ নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবার। আমাদের নুন আনতে পান্তার পানি শুকিয়ে যায়। তার উপর একটা বেকার ছেলেকে বসিয়ে বসিয়ে খাওয়ানো আমার বাবার পক্ষে সম্ভব না। আমার বাবা চিলেকোঠা রেখেছে আমি যাতে মাঝে মাঝে এখানে এসে বই পড়তে পারি। জানালার কাছে বসে চা খেতে খেতে গান গাইতে পারি। সেখানে সেই চিলেকোঠায় এখন বাস করছে এক গবেট। বাবাকে হয়ত একটা সময়ে আপনারা অনেক সাহায্য করেছেন। তাই বলে এভাবে আপনাকে কেনো পালবে আমার বাবা!
- বুঝলাম।
- কি ?
- যে তুই নেক্সট চার বছরে বিয়ে করবি না।
- মুগ্ধ ভাই আপনার কি এই ছাঁদ থেকে কখনো লাফ দিয়ে মরতে ইচ্ছে করে না?
- করে কিন্তু সাহসে কুলায় না।
- আমাকে বলবেন, আমি ধাক্কা দিয়ে দিবো। শহীদি মৃত্যু হবে। আর ওভাবে আমার দিকে তাকাবেন না। আমার চোখ এমন কোনো ইন্দ্রানির চোখ না যে হা করে তাকিয়ে থাকতে হবে। গেলাম।

এই মেয়েটাকে কেনো যেনো রাগলে একদমই সুন্দর লাগেনা। আর মেয়েদের নাকি অদৃশ্য চোখ থাকে। আনিশার তো দৃশ্যমান দু’চোখেই সমস্যা। আমি তাকিয়ে ছিলাম তার ডান কাধের উপর দিয়ে ফেলে রাখা বেণির দিকে। ইশশ, আরো কিছুক্ষন সামনে থাকলে ভালো হতো। কেনো যে আমি বাক্যালাপ দীর্ঘস্থায়ী করতে পারিনা। অসহ্য। কালো মেয়েদের অনেক অদ্ভুদ সব ব্যাপারে সুন্দর লাগে। চুপচুপা তেল দিয়ে বেণী করা একটা মেয়েকে যে সুন্দর লাগতে পারে তা আমার জানা ছিলো না। সামনে যতক্ষন ছিলো ততক্ষন কল্পনার জগতে ভালোই ডুবে ছিলাম। সেই জগতে দেখলাম আনিশা রান্না করছে।

আমি পিছন থেকে জড়িয়ে ধরে তার বেণীতে নাক দিয়ে ঘসা দিলাম। সে বললো, বেণী সরিয়ে ঘারে নাক ঘষতে। এরপরের ব্যাপার গুলো সেসময় ভাবতে ভালো লেগেছিলো এখন লজ্জা লাগছে। এখন বাজে দশ টা দশ। জাহিনের আসার কথা ছিলো দশটায়। হয়ত নিচে দাঁড়িয়ে আছে। চা যেহেতু দিলো না এখনো চা টা বাইরে থেকে খেয়ে নিতে হবে। আনিশা মনে হয় দেখেছে জানালার কাছে চায়ের কাপে কালকের চা রয়ে গেছে। কিন্তু সেই চা তো খাওয়া যাবেনা। সেই চা তো এক জোড়া চড়ুই পাখির যারা প্রতিদিন সকালে এসে চুক চুক করে খেয়ে যায়। তবে আজ এলোনা কেন?

জাহীন একটার পর একটা সিগারেট খেয়ে চলছে। গাড়ীতে নাকি তার বসলেই দম বন্ধ হয়ে আসে। শ্বাস নিতে পারলেও, ছাড়তে পারেনা। তখন এই সিগারেটের ধোয়ার মাধ্যমে শ্বাস ছাড়ে। আমার হাতে একটা পলিথিনে সেই পরোটা আর ভাজী। আমি দূরে সেই পরোটা ছুড়ে দিলাম। লুকিং গ্লাসে দেখলাম একটি কুকুর তার গন্ধ শুঁকছে। হঠাৎ জাহীন জিজ্ঞেস করলো।

- কিরে, আজো সেই স্বপ্ন দেখেছিস নাকি!
- দেখেছি।
-শুন, আমার একজন চেনা সাইক্রেটিক্স আছে। তার কাছে আজ তোকে নিয়ে যাবো। তুই তোর স্বপ্নের কথা কাউকে বলতে চাস না তাকেও বলার দরকার নেই। সাইক্রেটিক্সদের অনেক সময় কিছু না বললেও সমাধান দিতে পারে।
- আচ্ছা জাহীন, একটা মেয়ের বেণী নিয়ে কি সেক্সুয়াল ফ্যান্টাসী তৈরী হওয়া সম্ভব?
- সেক্সুয়াল ফ্যান্টাসী জিনিসটা অনেক বেশি জটিল। ধর, একটা দুই বেণী করা নর্তকী যার বেণিতে সবুজ রঙের ফিতা বাঁধা। সে তোর ঘরে তোর সামনে নগ্ন হয়ে নাচ দেখালো, তোর কাছে ব্যাপারটা খুব সাধারণ মনে হবে, বাজেও লাগতে পারে। কিন্তু সেই মেয়ে যদি পূর্ণিমায় চাঁদের আলোতে তোর সামনে শুধু দাঁড়িয়ে থাকে। তোর কাছ মনে হবে সেই সবুজ রঙ্গের ফিতাটা তোকে আরও বেশি টানছে।
- তোর দম আটকে যাচ্ছে।
- সিগারেট শেষ। কিনতে হবে। চল আগে বাসায় যাই। চা খেয়ে নিস।
- ঠিক আছে।
- বাসায় গাঁজা রোল করা আছে। গাঁজা খেয়ে কথা বলতে সুবিধা হবে।

- লোকটার নাম কি?
- রফিক জামান।
আমি জাহীনদের বাসার বারান্দায় বসে আছি। জাহীন এখনো ঘরের থেকে বের হচ্ছে না। চায়ের নামে এদিকে হুলুস্থুল কান্ড চলছে। যারিশা প্রথমে নিয়ে এসেছে পাউরুটি জেলী। এখন আবার নিয়ে এসেছে পনির। বেলের সরবত। আমি একে একে সব খাওয়া শেষ করলাম। সবশেষে চা নিয়ে এসে সামনে বসলো। যখন আসলাম তখন দেখেছিলাম যারিশা একটা সেলোয়ার কামিজ পরা। কখন জানি শাড়ি পরে এসেছে।
- মুগ্ধ ভাইয়া, আপনারা দু’জন কি আর জীবনেও চাকরি করবেন না?
- নারে, আমাদের ভাগ্যে ওসব নেই।
- বাবা প্যারালাইজড হওয়ার পর অনেকবার তাকে ব্যবসাটা দেখাশোনা করতে বলা হয়েছে, এখন তো বাবা ধরেই নিয়েছে আমার জামাইয়ের হাতেই ব্যবসা তুলে দিতে হবে।
- ভালো তো।

- যদি আপনার মতো স্বামী পাই, তাহলে তো ভালোই।
- কেনো?
- আপনি তো আর ব্যবসা নিজের নামে করে নিবেন না। দেখা যাবে ভাইয়াকেই বুঝিয়ে দুজন মিলে ব্যবসা দেখছেন। সুখী পরিবার।
- আমি যে নিজের নামে লিখবো না তা তোকে কে বললো?
- আপনার নাক। আপনি খাওয়ার আগে কখনো খাবার শুকে খান না। এধরণের মানুষ লোভী হয় না।
- ভালো খাবার অনেকদিন পর খেলে তা বাসি হলেও ভালো লাগে।
- যাই হোক। ভাইয়ার একটি ডাইরি আছে। সেখানে তার কিছু সিক্রেট লিখে রাখে। আপনি কি তা জানেন?
- না। তুই সেই ডাইরি পড়েছিস?
- জ¦ী। কান্না পাচ্ছে খুব। ভুল হয়েছে পড়াটা।
- আসলেই, এখন যদি ও তোর কোনো সিক্রেট জানে।
- মেরেই ফেলবে হয়তো। আমিও ওর মতো ডাইরি লিখছি একটা গতকাল থেকে। কোনোদিন পড়ে ফেললে মেরে ফেলবে আমাকে।
- সাবধান।

- আপনি কি ভাইয়ার পরিচিত নিতু নামে কোনো মেয়েকে চিনেন?
- চিনি, ভার্সিটিতে আমাদের সিনিয়র এক আপু।
- সেই মেয়ে নাকি ভাইয়াকে বলেছিলো, তার বুকে একটা তিল আছে সেই তিল নাকি ভাইয়াকে দেখাবে। কোনো এক জোছনায় বলে তাকে সেই তিল দেখাবে।
- মেয়েটা ভালো নাচ পারতো।
- ধুরু।
হঠাৎ জাহিন বের হয়ে আসলো। যারিশার কাছে যেয়ে গালে একটা থাপ্পড় দিলো।
- এখানে বসে বসে আমার বন্ধুকে শরীর দেখানো হচ্ছে?
যারিশা কাচুমাচু হয়ে বললো, “নাস্তা দিয়েছিলাম”
-ওড়না কোথায়?
- শাড়ির সাথে ওড়না কিভাবে পরবো?
- মানুষ শাড়ির সাথে চাদড় গায়ে দেয়। গরমকালে ওড়না গায়ে দিবি। শাড়ি পরার কারণটাই তো এখন ধরতে পারলাম। কি ভাবছিস, কমর দেখিয়ে শাড়ি পরলেই আমার বন্ধু তোর প্রেমে পরে যাবে! ভেতরে যা।

এরকম একটা পরিস্থিতির পর যারিশা হাসি মুখে আমাকে বললো, ভাইয়া, আবার আসবেন।
গাড়িতে বসে আমি আর জাহিন গাঁজা টানছি। মাথা টা হালকা ধরে এসেছে।
- বুঝলি মুগ্ধ, আমার না খুব ইচ্ছে খাগড়াছড়ির একটা পাহাড়ের মধ্যে কুঁড়ে ঘর বানিয়ে থাকি। সামনে থাকবে একটা ডাব গাছ সেটার নিচে থাকবে একটা মাচা। সামনের খালি জায়গায় জোছনার আলো পরবে সেই আলোতে নাচবে এক নর্তকী। কিন্তু ডাব গাছের ছায়ায় তো জোছনা ঢাকা পরে যাবে। কি করা যায় বলতো?

আমি অনেক চেষ্টা করেও জাহীনকে তার উত্তর দিতে পারলাম না। কারণ ততক্ষনে আমার মাথা পুরোপুরি আঁচল হয়ে গেছে যাকে বলে ব্ল্যাক আউট কিন্তু এর মাঝেও মাথায় একটা প্রশ্ন আসলো। পাহাড়ী অঞ্চলে ডাব গাছ হবে তো?
আমার সামনে যে লোকটা বসে আছে তার নাম সম্ভবত রফিক জামান। এতক্ষণ তার নাকটা অনেক বড় মনে হচ্ছিলো। পুরো মুখে শুধু নাকটাই দেখা যাচ্ছিল। এখন অবশ্য স্বাভাবিক লাগছে। কড়া এক কাপ চা খেতে দিয়েছেন। ধন্যবাদ জানানো উচিত কিন্তু স্যার বলবো নাকি বুঝতে পারছি না।
- তুমি কি এখন স্বাভাবিক?
- স্যার, আমি এতোদিন জানতাম দাঁড়ি হলে মানুষের বয়স বেড়ে যায়। আপনাকে তো খোঁচা দাঁড়িতে পয়ত্রিশ বছরের মনে হচ্ছে। আপনার বয়স নিশ্চয়ই এর থেকে বেশী।
- জ¦ী, পয়ঁতাল্লিশ।

- জ¦ী না, হ্যাঁ বলুন। তাহলে নিজেকে ছোট মনে হবে।
- তোমার বন্ধু বললো তোমার নাকি কিছু সমস্যা আছে।
- আমার বন্ধু! সেকি স্বাভাবিক ছিলো?
- হ্যাঁ, কারণ তুমি যা সেবন করেছো তা সে সেবন করেনি।
- হুম, বুঝলাম।
- তোমারা কি অনেক ভালো বন্ধু?
- জ¦ী, তবে আমার তাকে ভালো লাগে না।
- কেনো ?

- সে আমার অনেক ক্ষতি করেছে। আমি কেনো জানি তাকে কখনো কোনো কিছুতে না করতে পারিনি। মদ, গাঁজা। হঠাৎ একদিন এসে বলে,
“পড়াশুনা আর করবো না, শুধু হাটবো, ঘুরবো”। বিভিন্নভাবে আমাকে তাদের বাসায় নিয়ে যেতো।
- তাতে সমস্যা কোথায়?
- তার ছোট বোন। সে চায় তার ছোট বোনের সাথে আমি ঘনিষ্ঠ হই।
- এমনতো হতে পারে, ছেলে হিসেবে তার তোমাকে খুব পছন্দ তাই সে চায় তার বোনের সাথে তোমার বিয়ে হোক।
- তার বোনকে সে একদমই দেখতে পারে না।
- সে বলেছিলো, তুমি একটা স্বপ্ন দেখো যা তোমার স্বাভাবিক জীবনে প্রভাব ফেলছে।
-জ¦ী সাথে নিশ্চয়ই বলেছে আমি এই স্বপ্ন কখনো কাউকে বলতে পারবো না।
- বলেছে। শুনো, মাঝে মাঝে মানুষ তার নিজের সমস্যার সমধান নিজেই করে ফেলে। তুমিও কি কখনো নিজের সমস্যার সমাধান করতে পেরেছো?
- জ¦ী, একটি খুন করতে হবে।

- বুঝলাম, কবে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছো?
- স্যার, আমি আমার বাথরুমে একটা তেলাপোকার পরিবার পালি। তিন সদস্য। বাবা তেলাপোকাটা আমাকে এই বুদ্ধি দিয়েছিলো। ভেবেছিল সিরিয়াসলি নিবো না, কিন্তু বুদ্ধিটা ভালো লেগেছে। খুশি হয়ে ওদের সন্তানের নাম দিয়েছি, “লালু”।
- লালু কে ?
- আমার মায়ের পালা গরু। এখন কোথায় আছে জানি না। মা মারা যাবার পর বিক্রি করে দিয়েছিলাম।
- তোমার মা কিভাবে মারা গেলেন?
- একদিন মা লালুকে খাবার দিতে যাচ্ছিলো। হঠাৎ কেনো জেনো লালু মাকে একটা লাথি দেয় পেটে। সেই সময় কিছু হয়নি। মা হেসে বলছিলেন, “আরে ওটুকু বাছুড়ের লাথিতে কি হয়!” সেদিন রাতে গা পুড়ে জ¦র আসলো। মায়ের সারা শরীরে কাঁথা ভিজিয়ে দেওয়া হলো, তাও জ¦র কমলো না। রাতে মারা গেলো।

- তোমার বাবা কি বেঁচে আছেন?
- না, তিনি মারা গেলেন মানষিক রোগে। কেনো জানি তার সবাইকে নিজের শত্রু মনে হতো। যে কাছে যেতো তাকেই মারতে আসতো। একা একাই থাকতেন। হঠাৎ একদিন আমাকে ডাক দিলেন। কাছে যেতেই বললেন,”মুগ্ধ, বলতো তোর মা কেন তার আদরের গরুর লাথিতে মারা গেলো! গরুটারে তো সে খুব আদর করতেন। তাও কেন সেই গরু তারে লাথি দিলো। কারণটা আজকে বলি, তোর মারে জ্বীন ধরছিলো। সে হয়ে গেছিলো একটা পিশাচ। গরুরা তো এসব বুঝে তাই তোর মারে লাথি দিছিলো। সেই জ্বীনটাই আমারে জ্বালায়। আমারে স্বপ্নে বলে, তোরা আমারে মাইরা ফেলবি। আজকে জ্বীনটা চলে গেছে। সবাইরে আপন মনে হইতেছে। আমারে এক গ্লাস ডাবের পানি খাওয়াতে পারবি?” আমি সেদিন রাতে বাবাকে ডাবের পানি খাওয়াই। সে খুব খুশি হয়। আমার জন্য দোয়া করে ঘুম দেয়। পরদিন সকালে মারা যায়।

- মানষিক রোগটার নাম Delusional disorder of persecutory.
- ধন্যবাদ।
- তুমি তো পড়াশুনা করোনা। থাকো কোথায়?
- মামার বাড়ির ছাদের চিলেকোঠায়।
- একটা বেকার ছেলেকে তিনি খাওয়াচ্ছে ?
- জ্বী স্যার, ছোটবেলায় যখন আমার বয়স পাঁচ বছর তখন হঠাৎ মামা কি রাজনৈতিক সমস্যায় পরে। পুলিশ তাকে খুজতে থাকে। তখন প্রায় সাত মাস তিনি আমাদের সাথে আমাদের বাড়িতে ছিলেন। রুম দুটো ছিলো। তিনি আমার সাথেই ঘুমিয়েছেন সাত মাস।
- তিনি এখন কি করেন?
- মামা এখন সাবেক কাউন্সিলর। ডেমরা এলাকার।
- সাবেক! এই অভাবের সংসারে একটা বেকার ছেলে পালছে। নিশ্চয়ই অনেক ভালো মানুষ।
- স্যার, আমি উঠি। আনিশা আমার জন্য অপেক্ষা করবে। দুপুরের খাবার দিতে আসবে।
- আনিশা কে? তোমার মামাতো বোন?
- জ¦ী, অসাধারণ রুপবতী একটি মেয়ে।

- তাকে তুমি পছন্দ করো?
- পছন্দ করি নাকি জানি না তবে দৈহিক আকর্ষণ অনুভব করি।
- সেটাও ভালোবাসার অংশ। দৈহিক আকর্ষণ একটা সম্পর্ক অনেকদিন টিকিয়ে রাখতে পারে যা ভালোবাসাও পারে না। ভালোবাসার চাহিদা কমে যায়, বিলীনও হয়। দৈহিক চাহিদা বিলীন হয় না।
- আসি স্যার। আবার আসবো।
- খুন সম্পন্ন করে?
আনিশা খাবার নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। হাতের প্লেটে ভাত সাথে আছে ভেন্ডি ভাজি। ডালের পানিও হালকা দেখা যাচ্ছে।
- লেবু নেই রে?
- কাটা নেই।
- গাছে আছে তো। একটা ছুড়ি দিয়ে যা। আমি কেটে খাবো।
- আমাদের গাছে হাত দিলে আমি আপনার হাত কেটে ফেলবো।
- আচ্ছা।

আনিশার সাথে কথা কেনো যেনো বাড়ানো যায় না। স্নান করে এসেছিলো মনে হয়। ঘার বেয়ে ভেজা চুলের পানি গলায়ে বেয়ে গড়িয়ে বুকের দিকে যাচ্ছিলো। কি সুন্দর লাগছিলো। দুটো সমস্যা হয়ে গেলো। এক ছুড়িটা পাওয়া গেলো না। মন মতো খুন করতে পারবো না। আরেক সমস্যা হলো ভেন্ডি ভাজি নিশ্চয়ই তেলাপোকারা খাবেনা। দুপুরের খাবারটা তাদের বাদ পরে গেলো। চিলেকোঠার দরজা টা খোলা। ছাদে আনিশার কাপর শুকাতে দেওয়ার দৃশ্য দেখা যাচ্ছে। আজব তো! তাকে দেখতে মায়ের মত লাগছে কেন! শাড়ি পরার জন্য। আনিশা আজ শাড়িই বা পরেছে কেন? মায়ের গায়ের রং তো কালো ছিলো না তবে কেনো মায়ের মতো লাগছে।

মৃত মানুষের এই এক সুবিধা। যেমনটা জীবিত মানুষ নিরুদ্দেশ হয়। মৃত মানুষ কিন্তু কখনো জীবন থেকে নিরুদ্দেশ হয় না। তাদের আরেকজনের মাধ্যমে বাঁচিয়ে রাখা যায়। অনুভব করা যায়। সৃষ্টিকর্তা আমাদের ইহকালেও পরকালের কিছু সুখ ধার দিয়েছেন। আজ রাতে কাজটা সারতে হবে। যদিও হাতে কোনো সরঞ্জাম নেই। গলা টিপে মারার একটা প্ল্যান আছে। হ্যান্ড গ্লাভস পরতে হবে তাহলে। কিন্তু সেটা কিনার টাকা তো নেই। এখন আমি বসে আছি যারিশার সামনে। হালকা সেজেছে। আসার সময় সেই সাজ দেখেনি। কখন সাজলো মনে করতে পারছিনা। এই মেয়ের মধ্যে কিছু একটা আছে। এত দ্রুত কিভাবে কেউ কিছু করতে পারে।

- মুগ্ধ ভাইয়া, আজ আপনার জন্মদিন।
- তুই কিভাবে জানলি?
- গত বছর ভাইয়া আপনাকে একটা পাঞ্জাবি কিনে দিয়েছিলো এই দিনে।
- সেই হিসেবে আজ আমার জন্মদিন হবে তা তোকে কে বললো?
- জানি না। ধরে নিয়েছি। এই নিন আপনার গিফট।
- এর মধ্যে কি আছে?
- আমার ফোন। নতুন ফোন কিনে দেওয়ার মত পরিস্থিতি আমার নেই সেটা জানেন।
- তোর আমাকে দিলে তুই কিভাবে চলবি?
- ল্যান্ড ফোন দিয়ে।

- তোর বন্ধুরা ফোন দিলে?
- সিম চেঞ্জ করে দিয়েছি।
- আমি ফোন দিয়ে কার সাথে কথা বলবো?
- কারও সাথে না। পকেটে কিছু না থাকলে অস্তিত্বহীন মনে হয়। ফোনটা অস্তিত্ব রক্ষার্থে সাহায্য করবে।
- তোর ভাইয়া বাসায় নেই।
- নাহ, জানিও না কোথায়।
-সমস্যা নেই। রাতে দেখা হবে। আজ আসি তাহলে।
- আরেকটু বসুন।
- তোকে সুন্দর লাগছে। হ্যান্ড গ্লাভস কিনবো। কিছু টাকা দিতে পারবি।
আমি হেটে গেটের কাছে যাচ্ছি। পিছনে যারিশা দাঁড়িয়ে আছে বারান্দা দিয়ে। মনে হচ্ছে সে কাঁদছে। সুন্দর বললে কি কেউ কাঁদে?

রাত নয়টা। এই সময় রফিক জামান সাহেবের বাসায় যাওয়াটাকি উচিৎ।কাজটা যেহেতু হয়ে গেছে সেহেতু যাওয়া তো উচিৎ। মাথায় একটা গানের লাইন ভাসছে। সন্ধ্যায় চিলেকোঠায় থাকা অবস্থায় ছাদে মামা এসেছিলো। ছাদের একটা অংশে শ্যাওলা। সেখান থেকে শহরটা সুন্দর করে দেখা যায়। মামা সেখানে দাঁড়িয়ে শহর দেখছিলেন আর গান গাচ্ছিলেন। গানটা কি ছিলো! কোনোভাবেই মনে আসছে না। হঠাৎ ফোনটা বেজে উঠলো। ফোনটা এখনো প্যাকেটে মোড়া। কি আজব! একটা কাগজের প্যাকেটে করে কেউ ফোন গিফট করে।

- হ্যালো যারিশা, বল।
-ভাইয়া কিভাবে বুঝলেন আমি কল দিছি।
- নতুন সিম। নাম্বার তুই ছাড়া অন্য কারো জানার প্রশ্নও আসেনা।
- জাহিন ভাইয়াকে গত রাতে যে বেড়িয়েছে এখনো বাসায় ফেরেনি। আপনার সাথে দেখা হবার কথা ছিলো। আর যাইহোক ভাইয়া বাসায় না ফেরার মানুষ না।
- তোর জন্য তো ভালোই হলো।
- আপনি হয়তো জানেন না, আমার মা এই বাড়ির দ্বিতীয় বউ। এরপরও জাহিন ভাইয়া আমাকে অনেক আদর করে। একবার ক্লাস এইটে পড়ার সময় আমাদের ভূগল স্যার আমার বুকে হাত দেয়। সেটা আমি মাকে বলার সময় ভাইয়া দরজার কাছে দাঁড়িয়ে শুনে ফেলে। সেসময় ভাইয়া অনেক ছেলে-পেলে নিয়ে ঘুরতো কিন্তু সেদিন ভাইয়া একা যেয়ে স্যারকে মারে। মারার অপরাধে ভাইয়াকে আবার বাবা মারে। আমাদের বাড়ির সামনের লেবু গাছের শুকনো ডাল দিয়ে। ভাইয়ার রাতে জ¦র এসে পড়ে। রাত দুটায় হঠাৎ বাবা আমাকে ঘুম থেকে তুলে বসে লেবু দিয়ে চা বানা এক কাপ। সেই চা নিয়ে বাবা ভাইয়ার রুমে যায়। আমি দরজার কাছে দাঁড়ানো। ভাইয়াকে বাবা বললেন, “তুমি যা করেছ তা কি তুমি ঠিক মনে করো?” ভাইয়া কেঁদে কেঁদে উত্তর দিলো, “বোনের ইজ্জতটা ফিরে পেলে মনে করতাম যা করেছি ঠিক করেছি।”

- বুঝলাম, তুই কি কাঁদছিস?
- আপনি একটা কথা ঠিক বলেছিলেন, আমি যেহেতু ভাইয়ার ডাইরি পড়েছি। ভাইয়াও আমার ডাইরি পড়তে পারে।
- পড়েছে?
- হুম, আমার ডাইরিতে আমি শুধু একটা কথা লিখেছিলাম। ভাইয়া সেই লেখার নিচে লিখেছে, “এই স্বপ্ন কখনো অপূর্ণ রাখিস না।”
- তোরা দুই ভাইবোন দেখি প্রাইভেসির কিছুই জানিস না।
- ভাইয়া, আপনার কি জানতে ইচ্ছে করছে না? স্বপ্ন টা কি ছিল?
- না, মানুষের জিনিস কেন জানতে চাইব।
- কারণ স্বপ্নটা আপনাকে নিয়ে।
- তোর ফোনের ব্যালেন্স কি শেষ হচ্ছে না?
- ভাইয়া আমার স্বপ্নটা ছিলো, আমাদের ছাদে আমি আপনাকে বিশ মিনিট জড়িয়ে ধরে রাখবো। বাতাসে আমার চুল উড়বে। সেই চুল আপনার মুখে পরবে। আপনার শুরশুরি লাগবে। তাও কিছু করতে পারবেন না কারণ আপনিও আমাকে জড়িয়ে ধরে রাখবেন। একজন স্ত্রী হিসেবে।
- বুঝলাম।

- আমি ভেবেছিলাম এই জিনিস পড়লে ভাইয়া আমাকে মেরে ফেলবে। আচ্ছা, জাহিন ভাইয়া তো ভালো আছে তাইনা! জানেন আগামীকাল জোছনা। ভাইয়া নিশ্চয়ই সেই নিতু নামের মেয়েটার সাথে জোছনা বিলাস করতে গিয়েছে। কিন্তু আমি জানি, ভাইইয়া আর কোনোদিন আসবে না। কারণ সে তার ডাইরিটা নিয়ে গেছে।
আমি ফোনটা খট করে কেটে দিলাম। হ্যান্ড গ্লাভস কেনা হয়নি। টাকা পকেটে আছে। এক কাপ চা খেলে ভালো হতো। যেই রাস্তাটায় দাঁড়িয়ে আছি সেই রাস্তায় শুধু একটা ল্যাম্পপোষ্ট। আমি সেই আলোতে নিজেকে দেখলাম। একটু আগে আমি একটি কাজ করেছি। অথচ আমার মধ্যে তার কোনো প্রমাণ নেই। ইসস, জামাটায় যদি একটু রক্ত লাগানো থাকতো। তাহলে মানুষদেরকে একটু ভয় দেখানো যেত। আচ্ছা ভয় তো এখনো দেখানো যায়। ঝটপট আমি আমার পরনের গেঞ্জিটা খুলে হাতে নিলাম। পুরো উদোম অবস্থায় হাতে গেঞ্জি পেঁচিয়ে সামনের একটা টং এর সামনে দাঁড়ালাম। কন্ঠটা একটু মোটা করে বললাম।
- এই লাউলা, এক কাপ চা দে।
মধ্যবয়স্ক দোকানদার বলে উঠলো, ‌‌‍‍‍‍‍‍‍‌‌‌যা পাগলা, আজাইরা জালাইস না।

- স্যার, আমি উদোম দেখে কি আপনার অস্বস্তি হচ্ছে?
- না, বরং ভালো লাগছে। যেই গরম। আমারো তোমার মত জামা খুলে ফেলতে ইচ্ছে করছে।
- স্যার, আমি কাজটা সেড়েছি।
- জানি, ডেমরার সাবেক কাউন্সিলরের লাশ তার বাড়ীর পুবপাশে পাওয়া গিয়েছে। ধরে নেওয়া হয়েছে তিনি ছাঁদ থেকে পিছলে পরে গেছেন। কারণ ছাদের একপাশে শ্যাওলা ছিলো। সেখানে তার চপলের পিছলে যাওয়া ছাপ রয়েছে। খবরে দেখাচ্ছে। তবে বলেছিলে তার মেয়ে রূপবতী। আমার কাছে কিন্তু সেরকম লাগেনি। মেয়েটা কাঁদতে কাঁদতে সাংবাদিকদের বলছিলো বাড়িতে তারা চারজন থাকে। সে, তার বাবা, তার মা এবং গৃহকর্মী। তোমার কথা বলেনি কেনো বলতে পারো?
- আনিশাকে এলাকায় সবাই অনেক ভালো জানে। যদি আমার কথা বলে তাহলে অনেক কথা রটবে।
- তোমাকে সে সন্দেহ করেনি। সন্দেহ করলে নিশ্চয়ই মিডিয়ার সামনে তোমার কথা বলতো।
- আমাকে মামা অনেক আদর করতো সুতরাং, এ কথা তারা চিন্তাও করবে না।
- প্লাটফর্মটা ভালোই তৈরী হইয়েছিলো নয়ত খুনটা হয়ত করতে পারতে না।

- স্যার, খুনটা কেনো করেছি তা কি জানতে চান না?
- না, কারণটা আমি জানি। তবে জানতাম না। খবর শুনে জানলাম। তুমি বলেছিলে তোমার মামা ছোটবেলায় তোমাদের সাথে থাকে। সাথে বলেছিলে সাত মাস তিনি তোমার সাথে ঘুমিয়েছে। একটা মানুষ তার অতীত বলার সময় এরকম সাধরণ একটা কথা কখনোই উল্লেখ্য করবেনা। যেহেতু তুমি উল্লেখ্য করেছো বুঝে নিতে হবে এটা সাধরণ কিছু না। তোমার মামা তোমার সাথে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করেছিলো। সাত মাস ধরে তুমি তা সহ্য করেছো। সেটার থেকেই তোমাকে একটা দুঃস্বপ্ন প্রতিনিয়ত তোমাকে তাড়া করে। তাই তুমি খুনটা করেছ।

- স্যার, আপনার চেনা কোনো কাজী আছে? আমি কালকে বিয়ে করবো, দুপুরের আগে করতে হবে। কারণ যাকে বিয়ে করবো তার খুব ইচ্ছে আমাকে বিশ মিনিট ধরে জড়িয়ে ধরে রাখবে। দুপুরে রোদে তো এই কাজ সম্ভব না। সুতরাং, সন্ধ্যায় করতে হবে। পারবেন না স্যার?
- কালকে করার ই বা দরকার কি? পরেও তো করতে পারো।
- কাল তো জোছনা। সন্ধ্যায় সে যখন আমাকে জড়িয়ে ধরবে তখন জোছনার আলোতে তাকে দেখা যাবে। সেটা অন্য সময় নাও যেতে পারে। যে আমাকে জড়িয়ে ধরবে তাকে না দেখা গেলে ভালো লাগবে না ব্যাপারটা।

- তাহলে পরের জোছনার জন্য অপেক্ষা করো।
- সেই জোছনার জন্য প্ল্যান রেডি। খাগড়াছরিতে হানিমুনে যাবো। সেখানে আমার বন্ধু জাহিন, যে আমাকে আপনার কাছে দিয়ে গিয়েছিলো সে নিতু নামে একটা মেয়ের সাথে জোছনা বিলাস করবে। তাদের খুজে পেতে একটু কষ্ট হবে। কিন্তু ভালো সারপ্রাইজ দেওয়া যাবে। আচ্ছা, স্যার পাহাড়ী এলাকায় কি ডাব গাছ হয়?

- হতে পারে। তুমি কি আনিশাকে বিয়ে করবে?
- জ্বী না, জাহিনের বোন যারিশাকে।
- ওহ, তোমাকে সাহায্য করতে পারলাম না। আমার কোনো চেনা কাজী নেই।
- তাহলে বিয়েটা বিকেলে করতে হবে। খুজতে খুজতে দুপুর হয়ে যাবে। যাই স্যার।
রফিক জামান স্যার খুব স্বাভাবিক ভাবে আমার দিকে তাকিয়ে আছেন। তিনি কি বিশ্বাস করেছেন আমি মামাকে খুন করেছি। আচ্ছা আনিশাকি মামার চারিত্রিক সমস্যার কথা জানতো। হঠাৎ আমি হাঁটা থামালাম। আবার রফিক জামান স্যারের কাছে ফিরে এলাম।

- স্যার, আমি আসলে খুবই অসুস্থ একটি ছেলে। আমি কি সুস্থ হবো?
- তুমি চাইলে অবশ্যই সুস্থ হবে। যারিশা নামের মেয়েটি তোমাকে সুস্থ করতে পারবে।
- স্যার, এটা আপনার কেনো মনে হলো?
- তার স্বপ্ন পূরণের জন্য তোমার আকাঙ্ক্ষা দেখে।
- স্যার, আপনি কি আমাকে কিছু খাবার দিতে পারবেন। আমার পোষা তিনটি তেলাপোকা দুপুরে কিছু খায়নি। রাতে নিশ্চয়ই সেই বাসায় আজ রান্না হবে না। রাতে খাবার না পেলে বাবা এবং মা তেলাপোকা বেঁচে থাকলেও লালু মারা যাবে।

স্বাধীন বাংলা/এআর

পথশিশুর স্বপ্ন
                                  

দেখিনি মায়ের আদর মাখা মুখ
বুঝিনি বাবার ভালবাসায় স্বপ্নিল সুখ।
ঘুমাইনি মায়ের ওই আগলে রাখা বুকে
বুনিনি কোনো স্বপ্ন বাবারও চোখে।

কত মানুষ দিবানিশি হাঁটে পথের পাশে
প্রহর গুনি মা-বাবা এই বুঝি আসে।
সকালে বেরোয় দুমুঠো আহারের সন্ধানে
ঝড়বৃষ্টি, রোদ্দুরে মৃত্যুর কড়া ক্ষণে ক্ষণে।

নিশ্বাসের আশায় খাই অন্যের পঁচাবাসি
তবু্ও বেঁচে থাকার আনন্দে হাসি।
যায় অন্যের দ্বারে, নয়তো ময়লার স্তূপে
ক্ষুধার তাড়নায়, রোগ ব্যাধি অন্ত্রে সঁপে।

ঘুমায় রাতে সারি সারি পথের প্রান্তে
তীব্র শীতে জোটে না বস্ত্র তনুতে।
তবু্ও স্নিগ্ধ দু’চোখে স্বপ্ন আঁকি
বাবা-মা, আহার, নিভৃতে ঘুম থাকবে আপন বাড়ি।

- আসমা খাতুন
   শিক্ষার্থী: ইংরেজি বিভাগ,
   ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া

বাংলা ভাষা প্রতিষ্ঠায় মুসলমানদের অবদান
                                  

পৃথিবীর ইতিহাসে বাংলাই একমাত্র ভাষা, যার স্বীকৃতী লাভের জন্য সংগ্রাম করেছে পুরো একটি জাতি। প্রাণপণে সর্বোচ্চ দিয়ে লড়ে গেছে আপামর জনতা, অকালে নিজের জীবন বিলিয়ে দিয়েছে টকবগে যুবক থেকে থুরথুরে বৃদ্ধ পর্যন্ত, হাসিমুখে শাহাদাত বরণ করেছে অগণিত মানুষ। একমাত্র বাংলা ভাষাকে কেন্দ্র করেই গড়ে ওঠা সংগ্রাম জন্ম দিয়েছে একটি স্বাধীন-স্বার্বভৌম দেশ। বাঙালি মুসলমানদের দুটি বড় অহংকারের জায়গা রয়েছে, একটি তার দেশ, অন্যটি ভাষা।

বাংলা ভাষার উদ্ভব হয়েছে মোটামুটিভাবে দশম-একাদশ শতকে। সুনীতিকুমার, ড.মুহম্মদ শহীদুল্লাহ প্রমুখ ভাষাতাত্ত্বিক বাংলা ভাষার যে বংশাবলী নির্মাণ করেছেন তাতে দেখা গেছে, ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষাই কালের বিবর্তনে বাংলা ভাষায় রূপ নিয়েছে। পন্ডিতদের মতে, বাংলা ভাষার প্রাচীন রূপ দেখতে পাওয়া যায় বৌদ্ধ মরমি সাধকদের রচিত বৌদ্ধ গান ও দোহার মধ্যে। সেসময় বাংলা ভাষা বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী পাল রাজাদের পৃষ্ঠপোষকতার আমলে ছিল কিন্তু সে আমল দীর্ঘদিন স্থায়িত্ব লাভ করতে পারেনি। একাদশ শতকে পালদের পরাজিত করে সেন রাজত্ব উঠে আসে এবং বাংলার পরিবর্তে সংস্কৃত ভাষা রাজভাষা হিসেবে কায়েম হয়। সাথে সাথে সমস্ত কাজকর্মে একদিকে যেমন সংস্কৃতের জয়গান উঠে আসে অপরদিকে বাংলা ব্যবহারে নিরুৎসাহিতার রূপ ফুটে ওঠে। রাজপুরুষদের চাপে পড়ে ব্রাক্ষণ পন্ডিতরা ফতোয়া জারি করলেন: “অষ্টাদশ পরাণাননি রাম্যস্যস চবিতনিচু/ভষায়ং মানং শ্রুত রৌরবং নরক ব্রজেং”। অর্থাৎ, অষ্টাদশ পুরাণ ও রামায়ণ যে মানব রচিত বাংলা ভাষায় শ্রবণ করবে, সে রৌরব নরকে নিক্ষিপ্ত হবে।
 
১২০৩ সালে ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বখতিয়ার খিলজীর বঙ্গ বিজয়ের মাধ্যমে এ অঞ্চলে মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠত হয়। এতে উপমহাদেশে নতুন আলোর মিনারের সূচনা ঘটে। যার প্রভাবে একদিকে যেমন জাতিভেদ-লাঞ্ছিত বাংলার সমাজদেহে নীরব বিপ্লব দেখা দেয় অপরদিকে বিলীন হওয়া বাংলা ভাষা চর্চাতে নয়াদিগন্তের বিপ্লব ঘটে। এ সম্বন্ধে বিখ্যাত গবেষক ড. দীনেশচন্দ্র সেন বলেন: “হীরা কয়লার খনির মধ্যে থাকিয়া যেমন জহুরীর অপেক্ষা করে, শুক্তির ভিতর মুক্তা খনির মধ্যে থাকিয়া যেরূপ ডুবরীর অপেক্ষা করিয়া থাকে, বাংলা ভাষা তেমনি কোন শুভদিন, শুভক্ষণের সুযোগ আনায়ন করিল”। মুসলিম শাসনামলে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য চর্চার লালনে হিন্দু-মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের অনুরাগী সাহিত্যসেবকগণ রাষ্ট্রীয়ভাবে পৃষ্টপোষকতা লাভ করেন। মুসলিম শাসনের পতন যুগে উত্তর ভারতের মুসলিম শিক্ষিত সমাজের উদ্যোগে আরবি হরফ, আরবি-ফারসি শব্দভান্ডারে এবং হিন্দি উচ্চারণকে কেন্দ্র করে ‘উর্দু’ নামে একটি ভাষার জন্ম হয় এবং অল্পদিনের মধ্যেই তা উত্তর ভারতের সংস্কৃতিবহুল হিন্দুদের ব্যবহৃত হিন্দি ভাষার মুসলিম বিকল্প হিসেবে দাঁড়ায়।

১৭৫৭ সালে পলাশী বিপর্যয়ের পর বাংলাদেশে ইংরেজ শাসনের সূত্রপাত ঘটে যায়। উনিশ শতকের শুরুর দিকে ইংরেজ শাসকরা ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে বাংলা ভাষা থেকে মুসলমানদের দৈনন্দিন জীবনে ব্যবহৃত আরবি-ফারসি শব্দ বাদ দিয়ে সংস্কৃত কণ্টকিত অভিনব বাংলা ভাষা গড়ে তোলার আপ্রাণ চেষ্টা চালালে সেসময়কার মীর মোশারফ হোসেন, শেখ আব্দুর রহিম, মহাকবি কায়কোবাদসহ প্রমুখ মুসলিম কবি-সাহিত্যকগণ তা প্রতিহত করতে সক্ষম হন।
 
বিংশ শতাব্দীতে ব্রিটিশ-ভারতে স্বাধীনতা-আন্দোলন ধীরে ধীরে সাফল্যমন্ডিত ও শক্তিশালী হয়ে উঠতে থাকলে নতুন করে বাংলা ভাষার ভাবিষৎ নিয়ে আলোচনা-পর্যালোচনা শুরু হয়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের শেষ পর্যায়ে যখন কংগ্রেস নেতা এম.কে.গান্ধী রবী ঠাকুর কে ভারতবর্ষ স্বাধীনের পর সাধারণ ভাষা কী হতে পারে তা জানতে চাইলে তিনি হিন্দির পক্ষে অভিমত জ্ঞাপন করেন। ১৯৭১ সালে রবীন্দ্রনাথ যখন এ বিষয়ে আবার আলাপ-আলোচনা শুরু করেন ঠিক সময় ডক্টর মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ সুস্পষ্ট ভাষায় বলেন, ভারতবর্ষে বাংলা, উর্দু ও হিন্দি সাধারণ ভাষা হওয়ার যোগ্যতা রাখে। এরই উপলক্ষ্যকে কেন্দ্র করে বিংশ শতাব্দীর বিশের দশকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরী সুস্পষ্টরূপে বলে দেন, “ভারতবর্ষের অন্যান্য অঞ্চলে যে ভাষাই হোক না কেন, বাংলাদেশে বাংলা ভাষাই হবে সরকারি ভাষা’।

ইতিহাস পর্যালোচনার করে আমরা স্পষ্টাক্ষরভাবে জানতে ও বুঝতে পারি বাংলা ভাষার প্রতিষ্ঠায় মুসলিমদের অবদান কতখানি। বাংলা ভাষা প্রতিষ্ঠায় মুসলমান সমাজ যেভাবে অকাতরে পরিশ্রম ও যুদ্ধ করে গেছে তার তিনটি পয়েন্ট উল্লেখ করলেই জাজ্বল্যমান মুখপ্রান্ত সত্য সবার নিকটে উঠে আসবে। প্রথমত, ১৯৪৭ সালে দেশ ভাগের পর মুসলিম অধ্যুষিত পূর্ববঙ্গ থেকে বাংলা ভাষার রাষ্ট্রীয় মর্যাদা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সেদিন বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবির সুউচ্চ দীপ্ত কন্ঠে উথাপিত হলেও হিন্দু অধ্যুষিত পশ্চিমবঙ্গ থেকে বাংলাকে ভারতের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার কোন দাবি উত্থাপিত হয়নি। দ্বিতীয়ত, বাহান্নর ফ্রেবুয়ারিতে বাংলা ভাষার রাষ্ট্রীয় মর্যাদার দাবিতে যে তরুণেরা বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়ে এ আন্দোলন বেগবান, গতিশীল এবং পাকাপোক্ত ভিত্তির উপরে দাঁড় করিয়েছিলেন তাদের সবাই ছিল মুসলিম। তৃতীয়ত, ১৯৪৭ সাল থেকে শুরু করে আটচল্লিস ও বাহান্নের মধ্যে দিয়ে ছাপ্পান পর্যন্ত পদার্পণে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি আদায় না হওয়া পর্যন্ত প্রধানত পূর্ববঙ্গের তরুণ মুসলিম সমাজ-ই এই নেতৃত্ব দান করেন।

বাংলা ভাষার শৈশব, কৈশোরে এই ভাষার স্নেহ, লালন এবং উন্নয়নে যেরূপ এই মুসলিম অধ্যুষিত তরুণ সমাজ চোখধাঁধানো অবদান রেখেছিল ঠিক একইভাবে ব্রিটিশ শাসনের অবসানে বাংলা ভাষার রাষ্ট্রীয় মর্যাদা লাভের সংগ্রামেও একই ভূমিকা মুসলিম তরুণরাই পালন করে। বাংলা ভাষার রাষ্ট্রীয় মর্যাদা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বুকের তাঁজা রক্ত ঢাকার রাজপথে বিলিয়ে দিয়েছে তাঁরা সবাই ছিলেন মুসলিম তরুণ। সর্বোপরি বলা যায়, বাংলা ভাষার শিশু বয়স হতে আজ পর্যন্ত প্রতিটি ক্ষেত্র বেগবান, গতিশীল, লালন এবং উন্নয়নে রয়েছে মুসলমানদের গৌরবজনক অবদান।

সূত্র- বাংলা ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় মুসলমান(অধ্যাপক আবদুল গফুর), শুবাচ (ড.হায়াৎ মামুদ, ড.মোহাম্মদ আমীন), ইন্টারনেট।
মোহম্মদ শাহিন
শিক্ষার্থী, সুলিমুল্লাহ মুসলিম হল, ঢাকা বিশ্বাবিদ্যালয়।

কবি নয়, কবিতা হতে চাই
                                  

রাবেয়া সুলতানা

হে বরেণ্য কবি-
তোমার এতটুকু সময় হবে কি,
একটি মহাকাব্য লেখার?
যেখানে আমি থাকবো তোমার স্বপ্নচারিনীরূপে,
কাব্যরসে টইটুম্বুর একটি কবিতা হয়ে।
কবি নয়, আমি কবিতা হতে চাই,
হে কবি লিখে যাও অবিরাম,
তোমার ভালোবাসার কবিতা,
হতে চাই আমি সেই কবিতার শব্দগুচ্ছ,
যেন প্রতিমুহূর্তে কবিতার প্রেমেই পড়ি।
হে কবি, লিখে দাও একটি কবিতা,
যেখানে থাকবে উচ্ছ্বসিত সোনালী অতীত,
প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির হিসেব আর দীর্ঘশ্বাসের কথা।
অকুণ্ঠ জ্যোৎস্নায় ভিজে ভিজে স্বপ্নবুননের কথা।
হে কবি, ভালোবেসে লিখে দাও,
তিমির সরায়ে সরায়ে
রৌদ্রজ্জ্বল প্রভাতে পৌঁছানোর কথা।
যাপিত জীবনের ইতি কথা,
আলো-আধারিতে ঢেকে থাকা
বিরহ বিদূর জীবনের কাব্যগাঁথা।
হে প্রেমের কবি,
আমার কল্পরঙের সবটুকু রঙ তোমায় দিলাম,
লিখে দাও আমার গোপন অভিসারের কথা,
প্রতিমুহূর্তে ঝরে পড়ার কথা।
কবিতার প্রেমে পূর্ণ করে দাও,
আমার এ হৃদয়, অঙ্গন।
হে মানবতার কবি,
শব্দও বর্ণের ভাঁজে ভাঁজে সাজিয়ে দাও,
আমার মায়ের ভেঙ্গে যাওয়া স্বপ্নের কথা,
এক আশাহত রমনীর অসময়ে ঝরে পড়ার কথা।
হে দ্রোহের কবি, তুমি লিখে দাও-
আমার নীরবতার কথা,
বিদ্রোহী হয়ে ওঠার কথা,
একটি মায়াবী নক্ষত্রের ফেরারী হবার কথা।
তোমার মহাকাব্যে,
আমি বেঁচে থাকতে চাই অনন্তকাল,
বর্ণিল প্রেমের কবিতা হয়ে,
হবে কি সময় তোমার, হে কবি?

হায়রে বাঙালি
                                  

শোভা রাণী বিশ্বাস


তোমরা আমায় দাও যে এনে নাইলোনের-ই দড়ি,
কচু গাছের সাথে ঝুলে একটু খানি মরি।
নয়ত আমায় বিষ এনে দাও বোতল ধরে খাই,
তাও গো যদি মনের কোণে শান্তিটুকু পাই।
মৃত্যু মিছিল চলছে সারা বিশ্ব জুড়ে আজ,
থমকে গেছে জীবন তাদের বন্ধ সকল কাজ!
স্বপ্নটাকে থামিয়ে দিলো করোনামহামারি,
কানপাতলে যায় গো শোনা বুকের আহাজারি।
খুব ছোঁয়াচে রোগ যে এটা সর্ব লোকে জানে,
বাংলাদেশের মানুষগুলোর যায়না কথা কানে।
শোনাতে গেলে শোনে তারা বাম কানটা দিয়ে,
ডান কানটায় বের করে দেয় একটু সরে গিয়ে।
বাঙ্গালি জাতি বীরের জাতি নেই মৃত্যুর ভয়,
জীবন দেবে তবু তারা ঘরে থাকার নয়।
জনে জনে আপন মনে বাইরে সারাদিন,
ঘাড়ের উপর নৃত্য করে মস্ত বড় জীন।
উদমোষাঁড়ের মত ঘোরা বন্ধ আজ,
নয়তো তোমার কপাল জুড়ে পড়বে দুখের।
হে বিধাতা বীর বাঙ্গালির জাগ্রত হোক বোধ,
সচেতনতা-ই করতে পারে করোনা প্রতিরোধ।

চিবুকের কালো তিল
                                  

সুমি ইসলাম

এই মেয়ে জানো কি তুমি?
তোমার ঐ চিবুকের
কালো তিলটার
প্রেমে পরেছি আমি
বারবার ওই কালো
তিলটাকে ছুঁয়ে দেখতে
মন চাইছে
একটিবার কালো
তিলটাকে ছুঁয়ে
দেখবো বলে চলে আসি
তোমার কাছে
ছুটে আসি মাইলের পর
মাইল পাড়ি দিয়ে
যোজন যোজন দূরত্ব
কে পিছে ফেলে।
আকাশের বুকে যেমন
তারারা জ্বল জ্বল করে
তেমনি তোমারে
চিবুকের তিলটা
জ্বল জ্বল করে আমার
চোখের উপর
তোমার কাছে হাত
জোড় করে
বিনয়ের সাথে অনুরোধ করি
একবার ছুঁয়ে দেখতে
দাও কালো তিলটাকে,
আমি বারবার তোমার
চিবুকের তিলটাকে ভালোবাসতে চাই
একটি বার ছুঁয়ে দেখতে চাই
চিবুকের তিলটাকে।


   Page 1 of 4
     শিল্প সাহিত্য
সামাজিক দূরত্ব নাকি শারীরিক দূরত্ব?
.............................................................................................
শুভ্রতার প্রতীক শরৎকাল
.............................................................................................
করোনা পরাজিত যুবরাজ
.............................................................................................
আত্মজা
.............................................................................................
ছাত্র জীবনে নৈতিকতা ও মূল্যবোধ শিক্ষা প্রয়োজন
.............................................................................................
বঙ্গমাতা ফজিলাতুন্নেছা মুজিব
.............................................................................................
এবার করোনায় আক্রান্ত তসলিমা নাসরিন
.............................................................................................
পড়ালেখার উদ্দেশ্য কি চাকুরী জোগাড় মাত্র?
.............................................................................................
গল্পের মধ্যে গল্প
.............................................................................................
গল্প : সুখ
.............................................................................................
আজ আমার রাতের খাবার নেই
.............................................................................................
পথশিশুর স্বপ্ন
.............................................................................................
বাংলা ভাষা প্রতিষ্ঠায় মুসলমানদের অবদান
.............................................................................................
কবি নয়, কবিতা হতে চাই
.............................................................................................
হায়রে বাঙালি
.............................................................................................
চিবুকের কালো তিল
.............................................................................................
মা দিবসে কবি আলম হােসেনের অসাধারণ কবিতা
.............................................................................................
বল্টু
.............................................................................................
দানেই সুখ!
.............................................................................................
অতি চালাকের গলায় দড়ি
.............................................................................................
কোভিড-১৯ ও একটি মধ্যবিত্ত পরিবারের ভাঙন
.............................................................................................
জসিম উদ্দিনের ‘কবর’ কবিতাটি করোনা ভার্সনে রূপান্তর!
.............................................................................................
ঘুমহীন হৃদয়
.............................................................................................
অনুশোচনা
.............................................................................................
জাতীয় কবি নজরুলের প্রয়াণ দিবস আজ
.............................................................................................
একাকিত্বে বহুত্ব
.............................................................................................
কাপালিকের দেশে
.............................................................................................
চলতি বছরের নোবেল সাহিত্য পুরস্কার স্থগিত
.............................................................................................
ময়মনসিংহে সাহিত্য উৎসব অনুষ্ঠিত, পুরস্কৃত হলেন ৪ গুণীজন
.............................................................................................
প্রথম মৃত্যু
.............................................................................................
শুভংকরের ফাঁকি
.............................................................................................
বউ যেভাবে ঘরে আসে
.............................................................................................
মধ্যরাতের কথা
.............................................................................................
বাঙালির রক্তের বন্ধন ও জাতি-পরিচয়
.............................................................................................
মোহময়ী পিরামিড
.............................................................................................
৮২তম জন্মদিনে ফুলেল শুভেচ্ছায় সিক্ত কবি আল মাহমুদ
.............................................................................................
পাবনা বইমেলা সাহিত্যকে সম্মৃদ্ধির পথে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে
.............................................................................................
প্রসঙ্গ: ঐতিহাসিক জ্বীনের মসজিদ
.............................................................................................
তেহরানে প্রথম বিশ্বের স্বাধীনতাকামী আন্দোলন
.............................................................................................
একলা মানুষ
.............................................................................................
নৈশভোজে আসছিস্ তো
.............................................................................................
স্বপ্ন ছিলো
.............................................................................................
ফেরা
.............................................................................................
ডি.লিট ডিগ্রি পাচ্ছেন হাসান আজিজুল হক ও সেলিনা হোসেন
.............................................................................................
বিশ্ববিখ্যাত ১০ নারীর জীবনীগ্রন্থ
.............................................................................................
কবি রফিক আজাদ আর নেই
.............................................................................................
পরপারে চলে গেলেন একুশে পদকপ্রাপ্ত কবি রফিক আজাদ
.............................................................................................
অমর একুশে গ্রন্থমেলায় শামস সাইদ এর দুটি কিশোর উপন্যাস
.............................................................................................
ঘুম আছে স্বপ্ন নেই
.............................................................................................
নীলফামারীতে পাল আমলের নিদর্শন পাওয়া গেছে
.............................................................................................

|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|

সম্পাদক ও প্রকাশক : মোহাম্মদ আখলাকুল আম্বিয়া
নির্বাহী সম্পাদক: মাে: মাহবুবুল আম্বিয়া
যুগ্ম সম্পাদক: প্রদ্যুৎ কুমার তালুকদার

সম্পাদকীয় ও বাণিজ্যিক কার্যালয়: স্বাধীনতা ভবন (৩য় তলা), ৮৮ মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকা, ঢাকা-১০০০। Editorial & Commercial Office: Swadhinota Bhaban (2nd Floor), 88 Motijheel, Dhaka-1000.
সম্পাদক কর্তৃক রঙতুলি প্রিন্টার্স ১৯৩/ডি, মমতাজ ম্যানশন, ফকিরাপুল কালভার্ট রোড, মতিঝিল, ঢাকা-১০০০ থেকে মুদ্রিত ও প্রকাশিত ।
ফোন : ০২-৯৫৫২২৯১ মোবাইল: ০১৬৭০৬৬১৩৭৭

Phone: 02-9552291 Mobile: +8801670 661377
ই-মেইল : dailyswadhinbangla@gmail.com , editor@dailyswadhinbangla.com, news@dailyswadhinbangla.com

 

    2015 @ All Right Reserved By dailyswadhinbangla.com

Developed By: Dynamic Solution IT